• মঙ্গলবার , ২১ এপ্রিল, ২০২৬ | ৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অশ্বিনী কুমার ব্রত ও “ব্রতের ভাত” নেহাল আহমেদ

অশ্বিনী কুমার ব্রত ও “ব্রতের ভাত” নেহাল আহমেদ

নেহাল আহমেদ: বিশেষ প্রতিনিধি রাজবাড়ী
নেহাল আহমেদ: বিশেষ প্রতিনিধি রাজবাড়ী

প্রকাশিত: ১১:১০ ১৯ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের এমন এক অঞ্চল আছে, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও মানবিকতা একসাথে মিশে এক অনন্য সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। সেই সংস্কৃতির অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো “অশ্বিনী কুমার ব্রত”, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চট্টগ্রাম ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নারীদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

অশ্বিনী কুমারদ্বয় হিন্দু পুরাণে দেব চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। তাঁরা রোগব্যাধি নাশ এবং দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ দেন বলে বিশ্বাস করা হয়। অশ্বিনী কুমার বা অশ্বিনী দেবতা হলেন দেবযমজ চিকিৎসক, সূর্যদেবের সন্তান। ঋগ্বেদের সময় থেকেই তাঁরা পূজিত হয়ে আসছেন। দেবতার চিকিৎসক হিসেবে তাঁদের গুরুত্বের কারণে এই ব্রতের উৎপত্তি। নারীরা এই ব্রত পালন করেন পরিবারের স্বাস্থ্য, স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সন্তানের মঙ্গল কামনায়। এটি কেবল একটি পূজা নয়— বরং এক আত্মিক সাধনা, যা গৃহস্থ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলে এই ব্রত পালনের ঐতিহ্য আজও বহমান। শরৎ বা হেমন্তের কোনো শুভ তিথিতে নারীরা নিরামিষ আহার করে, প্রদীপ জ্বেলে দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করেন। তাঁদের ব্রতের লক্ষ্য হলো রোগমুক্ত জীবন ও সংসারের শান্তি।

এই ব্রতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো “ব্রতের ভাত”। সাধারণ উপকরণ দিয়ে তৈরি এই ভাতে থাকে চাল, ডাল, শাক, আলু ভাজি, নারকেল, কলা, কখনও কখনও মিষ্টান্ন বা পিঠা। ব্রত শেষে এই ভাত দেবতার উদ্দেশে নিবেদন করা হয়। এরপর এটি প্রসাদ হিসেবে পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশীর মাঝে ভাগ করা হয়। এই “ভাগাভাগি” একটি সামাজিক ও মানবিক শিক্ষা দেয়—খাবার, মঙ্গল এবং আশীর্বাদ যখন ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। অনেক সময় মুসলমান বা ভিন্ন ধর্মের মানুষও এই প্রসাদ পান, যা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সহাবস্থানের নিদর্শন।

আজও এই ব্রতের আবহ জীবন্ত। কখনও এটি খুব নিঃশব্দে পালিত হয়, কখনও খুব আন্তরিকভাবে। একজন গৃহ সহকারী, পম্পি দাস, উদাহরণস্বরূপ, নিজের কর্মস্থলে “ব্রতের ভাত” নিয়ে আসেন—জেনে যে সেখানে ব্রত পালন হয়নি। তিনি বিশ্বাস করেন, শুভ ব্রতের ভাত ভাগ করলে ঘরে মঙ্গল আসে। এই ছোট কাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাজের এক গভীর মূল্যবোধ—ভক্তি, আন্তরিকতা ও মানবিক বন্ধন।

অশ্বিনী কুমার ব্রত কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি এক লোকঐতিহ্যের প্রতীক, যা সময়ের পরিক্রমায় চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল করেছে। এই ব্রত শেখায়—মঙ্গল একা অর্জিত হয় না, বরং ভাগ করে নিতে হয় সবার সঙ্গে। “ব্রতের ভাত” তাই কেবল ভাত নয়, বরং একটি ঐতিহ্যের স্বাদ, যেখানে বিশ্বাস ও ভালোবাসা এক হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/