• মঙ্গলবার , ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসন, স্বৈরাচার বিতর্ক ও পতনের গল্প

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসন, স্বৈরাচার বিতর্ক ও পতনের গল্প

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭:০২ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের একজন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর প্রায় নয় বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।

এরশাদের শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে উন্নয়নমূলক কিছু উদ্যোগ, প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের জন্য আলোচিত।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে তাঁর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতা ছাড়ার পরও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং জাতীয় পার্টিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু একজন সামরিক শাসকের গল্প নয়; বরং বাংলাদেশের সামরিক শাসন, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, নির্বাচন, রাজনৈতিক জোট এবং ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কে ছিলেন?

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সামরিক কর্মকর্তা। তিনি ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি প্রায় সাত বছর দেশ পরিচালনা করেন। তাঁর শাসনামলে দেশে উপজেলা ব্যবস্থা চালু, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করা হয়।

তবে একই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ, বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং সামরিক শাসনের কারণে তাঁর সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কোচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে।

তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং সামরিক জীবনে ধীরে ধীরে উচ্চপদে উন্নীত হন।

সামরিক বাহিনীতে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

সেনাবাহিনীতে এরশাদের ক্যারিয়ার

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর এরশাদ বিভিন্ন সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন এবং যুদ্ধের পর বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন।

১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ বা সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সামরিক বাহিনীতে তাঁর শক্তিশালী অবস্থানই পরবর্তীতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৮২ সালে ক্ষমতা গ্রহণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে এরশাদ সামরিক আইন জারি করেন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিজের হাতে নেন।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং দেশে সামরিক শাসনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কেন এরশাদ ক্ষমতা নিলেন?

এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নানা সংকটের কথা তুলে ধরেছিলেন।

তিনি দাবি করেছিলেন যে দেশের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।

তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর ক্ষমতা গ্রহণকে সামরিক অভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্রের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছিল।

পরবর্তীতে তাঁর শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক শাসনের অন্যতম প্রধান উদাহরণ হিসেবে পরিচিত হয়।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে এরশাদ

১৯৮৩ সালে এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় বিভিন্ন পরিবর্তন আনেন।

তাঁর সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল উপজেলা ব্যবস্থা চালু করা।

উপজেলা ব্যবস্থা চালু

এরশাদ সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক উদ্যোগগুলোর একটি ছিল উপজেলা ব্যবস্থা।

দেশের প্রশাসনকে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা চালু করা হয়।

এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে উপজেলা ব্যবস্থাকে কেউ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন, আবার সমালোচকেরা এটিকে এরশাদ সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

এরশাদের শাসনামলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড

এরশাদ সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থাকলেও তাঁর সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কারণ তিনি সামরিক ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর শাসনের বড় একটি অংশ সামরিক আইন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল।

ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা

এরশাদ সরকারের সময় বাংলাদেশের সংবিধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।

১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।

এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সমর্থকেরা এটিকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখলেও সমালোচকেরা এটিকে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন হিসেবে সমালোচনা করেন।

এরশাদ ও রাজনৈতিক দল

ক্ষমতা গ্রহণের পর এরশাদ ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন।

১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় পার্টি

এরশাদ জাতীয় পার্টিকে ব্যবহার করে সামরিক শাসন থেকে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন

এরশাদ সরকারের অধীনে ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয়।

জাতীয় পার্টি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং এরশাদ রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করেন।

তবে নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ছিল।

অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগও ওঠে।

১৯৮৮ সালের নির্বাচন ও বিতর্ক

১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আরও বেশি বিতর্কের জন্ম দেয়।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।

এর ফলে জাতীয় পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে যায়।

বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মনে করেনি এবং এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন

এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বামপন্থী দলগুলো বিভিন্ন সময়ে আলাদা ও সম্মিলিতভাবে আন্দোলন গড়ে তোলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাজনৈতিক কর্মসূচি, হরতাল, মিছিল ও বিক্ষোভ ধীরে ধীরে এরশাদ সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলন

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্র আন্দোলন যুক্ত হয়ে বড় ধরনের গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এর মাধ্যমে তাঁর প্রায় নয় বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

এরশাদের পতনের কারণ

এরশাদের পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল।

প্রথমত, সামরিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের কারণে তাঁর সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

দ্বিতীয়ত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আন্দোলন তাঁর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

তৃতীয়ত, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।

চতুর্থত, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন তাঁর সরকারকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়।

সবশেষে গণআন্দোলনের চাপে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

এরশাদকে ‘স্বৈরাচার’ বলা হয় কেন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদকে প্রায়ই ‘স্বৈরশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এর প্রধান কারণ হলো তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় সামরিক আইন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছিলেন।

বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, আন্দোলন দমন, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার অভিযোগ তাঁর শাসনামলকে বিতর্কিত করেছে।

তবে তাঁর সমর্থকেরা তাঁর প্রশাসনিক সংস্কার, উপজেলা ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উদ্যোগকে তাঁর শাসনের ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেন।

এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা

ক্ষমতা ছাড়ার পর এরশাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।

এর মধ্যে সরকারি অর্থ ও সম্পদের অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ ছিল।

কিছু মামলায় তাঁর সাজাও হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান।

এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।

তবে তাঁর সমর্থকেরা এসব মামলার কিছু অংশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেছিলেন।

ক্ষমতা ছাড়ার পরও রাজনীতিতে সক্রিয়

১৯৯০ সালে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও এরশাদ রাজনীতি থেকে অবসর নেননি।

বরং তিনি জাতীয় পার্টিকে সংগঠিত করেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে দলকে অংশগ্রহণ করান।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি উল্লেখযোগ্য আসন লাভ করে।

এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে ক্ষমতা হারানোর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল।

কারাগার ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন

এরশাদকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছিল।

কারাগারে থাকা অবস্থাতেও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি।

জাতীয় পার্টি তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিতে থাকে এবং সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আসন অর্জন করে।

পরবর্তীতে তিনি আবারও সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

এরশাদ ও জাতীয় পার্টি

জাতীয় পার্টির সঙ্গে এরশাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

দলটি মূলত তাঁর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান করেছে।

কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে, কখনো বিএনপির সঙ্গে জোট বা রাজনৈতিক সমঝোতায় গিয়ে জাতীয় পার্টি সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এরশাদ ও জোটের রাজনীতি

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এরশাদ ছিলেন জোট রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

ক্ষমতা হারানোর পরও তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন।

জাতীয় পার্টির সংসদীয় আসনসংখ্যা অনেক সময় সরকার গঠনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি করেছে।

এ কারণে এরশাদকে বাংলাদেশের ‘কিংমেকার’ রাজনীতিকদের একজন হিসেবেও অনেকে দেখতেন।

এরশাদের ব্যক্তিজীবন

এরশাদের ব্যক্তিজীবনও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল।

তাঁর একাধিক বিয়ে এবং পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদও জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এরশাদের ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক জীবন এবং পারিবারিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে তিনি দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

এরশাদ ও রওশন এরশাদ

রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এরশাদের জীবদ্দশায় দলটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

পরবর্তীতে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দলটির অভ্যন্তরে মতবিরোধ দেখা দেয়।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এরশাদ

এরশাদ শুধু রাজনীতিতেই নয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও আগ্রহী ছিলেন।

তিনি কবিতা লিখতেন এবং তাঁর লেখা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।

রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাঁর সাহিত্যচর্চা নিয়ে যেমন আগ্রহ ছিল, তেমনি সমালোচকেরাও তাঁর সাহিত্যকর্মকে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখেছেন।

এরশাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

এরশাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অত্যন্ত জটিল।

একদিকে তিনি সামরিক শাসনের প্রতীক এবং গণতন্ত্রবিরোধী শাসনের জন্য সমালোচিত।

অন্যদিকে তাঁর উপজেলা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জাতীয় পার্টির মাধ্যমে পরবর্তী সংসদীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ।

তাঁর শাসনামল নিয়ে ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও ভিন্নমত রয়েছে।

এরশাদের মৃত্যু

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়।

এরশাদের শাসনামল: ভালো না খারাপ?

এরশাদের শাসনামলকে এক কথায় ভালো বা খারাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

তাঁর সময় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উপজেলা ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু একই সময়ে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করা, বিরোধী আন্দোলন দমন এবং বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে তাঁর সরকার ব্যাপক সমালোচিত হয়।

তাই তাঁর শাসনামল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক—দুই দিকই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এরশাদের অবস্থান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদ এমন একজন ব্যক্তি যাঁকে বাদ দিয়ে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের রাজনীতি বোঝা কঠিন।

তিনি সামরিক বাহিনী থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় উঠে এসেছিলেন। প্রায় নয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। পরে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়েন।

কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরও রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব শেষ হয়নি।

বরং জাতীয় পার্টির মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখেন।

উপসংহার

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়।

সামরিক কর্মকর্তা থেকে সেনাপ্রধান, সেখান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি—তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা ছিল ব্যতিক্রমী।

তাঁর শাসনামলে উপজেলা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করা, বিরোধী আন্দোলন দমন এবং নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তাঁর শাসনকে ব্যাপকভাবে সমালোচিত করেছে।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে তাঁর পতন হলেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পরবর্তী কয়েক দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

কেউ তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন স্বৈরশাসক হিসেবে দেখেন, কেউ আবার তাঁর প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক দক্ষতার কথা তুলে ধরেন। বাস্তবে এরশাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।

তাঁর জীবন ও শাসনামল তাই শুধু একজন রাষ্ট্রপতির জীবনী নয়; এটি বাংলাদেশের সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, রাজনৈতিক আন্দোলন, নির্বাচন, জোট রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিজ্ঞাপন