জিন্নাহ-শেখ মুজিব সম্পর্কের অজানা অধ্যায়, কী হয়েছিল ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে?


প্রকাশিত: ০১:৫৪ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। জিন্নাহর ছবি কেন বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরা একটি সংগ্রহশালায় থাকবে, আবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে তাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়াও কতটা যুক্তিযুক্ত—এই দুই প্রশ্নই এখন আলোচনায়।
১৩ সেপ্টেম্বর সংস্কার শেষে ডাকসু সংগ্রহশালা খুলে দেওয়ার পর সেখানে জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায়। এর মধ্যে একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তার ভাষণের সময়কার। আরেকটি ছিল ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের দলগত ছবি। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরে জানায়, জিন্নাহর ছবি যেভাবে প্রদর্শিত হয়েছে তা ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বিষয়টিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ডাকসুর সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করার জন্য নয়, বরং বাংলা ভাষার বিরোধিতাসহ ইতিহাসের একটি অধ্যায় দেখানোর জন্য ছবিগুলো রাখা হয়েছিল।
এই বিতর্ক বোঝার জন্য জিন্নাহকে কেবল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জানলে পুরো ইতিহাস ধরা পড়ে না। একইভাবে তাকে শুধু বাংলা ভাষার বিরোধিতাকারী হিসেবে দেখলেও তার প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের জটিলতা বোঝা যায় না।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ভারতে আইন বিষয়ে শিক্ষার জন্য তরুণ বয়সে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। ভারতে ফিরে বোম্বেতে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তানের সরকারি জীবনীতে তাকে আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের শুরু কিন্তু পৃথক পাকিস্তান দাবির মধ্য দিয়ে হয়নি। শুরুতে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে কাজ করেন। ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সময় তাকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের একজন প্রবক্তা হিসেবেও দেখা হতো।
১৯১৩ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। সময়ের সঙ্গে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক সুরক্ষা তার রাজনীতির প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়। ১৯২৯ সালে তিনি বিখ্যাত চৌদ্দ দফা প্রস্তাব করেন। এতে ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থায় মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি ছিল। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের আর্কাইভেও জিন্নাহর চৌদ্দ দফার ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষিত রয়েছে।
১৯৩০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতীয় রাজনীতির পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থাও প্রকাশ পায়। এরপর জিন্নাহ দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর রাজনীতিকে একটি বৃহত্তর সর্বভারতীয় দাবির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক যে প্রস্তাব উত্থাপন করেন, সেটিই পরবর্তীকালে লাহোর প্রস্তাব নামে পরিচিত হয়। ওই প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে স্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোর ধারণা সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের রাজনীতি এই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে পৃথক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নাম সামনে আসে—শেখ মুজিবুর রহমান।
বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় অনেক সময় দাবি করা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জিন্নাহর নির্বাচনে কাজ করেছিলেন। বক্তব্যটি এভাবে বললে ঐতিহাসিকভাবে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ থাকে। শেখ মুজিব জিন্নাহর কোনো ব্যক্তিগত নির্বাচনী আসনের প্রচারণা করেননি। তিনি ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবং পাকিস্তান দাবির পক্ষে বাংলায় সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী কাজ করেছিলেন।
তখন শেখ মুজিব ছিলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী তরুণ মুসলিম লীগ কর্মী। বাংলাপিডিয়ার বঙ্গবন্ধুর জীবনীতে বলা হয়েছে, ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ শেখ মুজিবকে ফরিদপুর জেলায় দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব দিয়েছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শেখ মুজিব নিজেই তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সেই নির্বাচনী কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, নির্বাচনের সময় মুসলিম লীগ থেকে নির্দেশ আসে কর্মীদের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে নির্বাচনী অফিসের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। শেখ মুজিবকে দেওয়া হয় ফরিদপুর জেলার দায়িত্ব। তার নিজের ভাষায়, “আমাকে ফরিদপুর জেলার ভার দেওয়া হয়েছিল।” এরপর তিনি ফরিদপুরে নির্বাচনী অফিস স্থাপন করেন এবং মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় অফিস ও কর্মী শিবির গড়ে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা করেন।
বই রেফারেন্স: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, প্রকাশক দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড বা UPL। বইটির ১৯৪৫-৪৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনাবলি ও নির্বাচনী অধ্যায়ে এই বিবরণ রয়েছে। সংস্করণভেদে পৃষ্ঠা নম্বর কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। বইটির প্রকাশনা তথ্যও UPL সংস্করণের সঙ্গে মেলে।
শেখ মুজিব তার স্মৃতিকথায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনটি পাকিস্তান প্রশ্নকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখন তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির পক্ষে। নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের বড় বিজয় নিয়েও তিনি লিখেছেন।
ঐতিহাসিক গবেষক ইয়ান ট্যালবটও তার Pakistan: A Modern History বইয়ে চল্লিশের দশকে বঙ্গীয় মুসলিম লীগকে গণভিত্তিক সংগঠনে পরিণত করার কার্যক্রমের সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিবের যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে শেখ মুজিবও ছিলেন এবং জেলা পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারে এসব তরুণ কর্মী ভূমিকা রাখেন।
বই রেফারেন্স: Ian Talbot, Pakistan: A Modern History।
১৯৪৬ সালের নির্বাচনের ফল মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবিকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী করে। বাংলায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ১১০টিতে জয়লাভ করে বলে বাংলাপিডিয়ার মুসলিম লীগবিষয়ক নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে। এই নির্বাচনের ফলের পর জিন্নাহ ভারতীয় মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করেন।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথায় আরেকটি আকর্ষণীয় ঘটনা পাওয়া যায়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পর জিন্নাহ দিল্লিতে মুসলিম লীগপন্থী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন ডাকেন। বাংলা থেকে মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মীরা একটি বিশেষ ট্রেনে দিল্লি যান। ট্রেনটির নাম দেওয়া হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল। শেখ মুজিবও ছাত্রকর্মীদের একটি দলের সঙ্গে সেই ট্রেনে ছিলেন। তার স্মৃতিকথায় সেই যাত্রায় পাকিস্তান, মুসলিম লীগ, জিন্নাহ ও সোহরাওয়ার্দীর নামে স্লোগান দেওয়ার বর্ণনাও আছে।
বই রেফারেন্স: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, UPL।
এই তথ্যগুলো বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় শেখ মুজিবই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পূর্ববাংলার ভাষা, রাজনৈতিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেন।
এটি দক্ষিণ এশিয়ার ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বাংলার অনেক মুসলমানের কাছে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় পাকিস্তানি নেতৃত্বের ভাষা ও ক্ষমতা বণ্টনের নীতি নিয়ে পূর্ববাংলায় দ্রুত অসন্তোষ তৈরি হয়।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। জিন্নাহ নতুন রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন। একই সময় তাকে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পাকিস্তানের সরকারি ইতিহাসে তাকে কায়েদে আজম বা মহান নেতা এবং রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সম্মানিত করা হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঠিক আগে ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট গণপরিষদে জিন্নাহ একটি বহুল আলোচিত ভাষণ দেন। সেখানে তিনি নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের ধারণা তুলে ধরেন এবং ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার কথা বলেন। জিন্নাহর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনায় এই ভাষণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ভাষণটির সরকারি প্রতিলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে জিন্নাহর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে।
নতুন রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। এরপরও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব উর্দুকে একক রাষ্ট্রভাষা করার দিকে এগোয়।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে পূর্ববাংলার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে পরিষদের ব্যবহৃত ভাষাগুলোর একটি করার প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পূর্ববাংলায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের আন্দোলন শুরু হয়।
এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানও ভাষার দাবির আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে যে ধর্মঘট ও আন্দোলন হয়, সেখানে শেখ মুজিবসহ কয়েকজন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন বলে বাংলাপিডিয়ার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ মাত্র দুই বছর আগেও যে শেখ মুজিব জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করেছিলেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভাষার প্রশ্নে তিনি সেই মুসলিম লীগ সরকারের নীতির বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের এই পর্বটি বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী; অন্যদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম তরুণ সংগঠক।
এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাঝেই ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ জিন্নাহ পূর্ববাংলা সফরে ঢাকায় আসেন।
২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এরপর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। সেখানে উপস্থিত ছাত্রদের একাংশ তার বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান। কার্জন হলের ইতিহাস নিয়ে বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। জিন্নাহর বক্তব্য বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিকে থামাতে পারেনি; বরং পূর্ববাংলায় বিরোধিতা আরও বিস্তৃত হয়।
তবে ইতিহাসের সময়রেখায় একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়, তখন জিন্নাহ জীবিত ছিলেন না। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। তাই বায়ান্নর গুলিবর্ষণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে জিন্নাহকে দায়ী করা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার অবস্থান পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
জিন্নাহর জীবনী তাই কয়েকটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্পও।
প্রথম জীবনে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলিম সমঝোতা চেয়েছিলেন। এরপর মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দেন। পরে তার নেতৃত্বেই পাকিস্তান আন্দোলন শক্তিশালী হয় এবং ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তার ১১ আগস্টের ভাষণে ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে নাগরিক সমতার ধারণা থাকলেও ভাষার প্রশ্নে পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দাবিকে তিনি মেনে নেননি। এই দুটি অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
শেখ মুজিবের রাজনৈতিক যাত্রার সঙ্গেও এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে। তিনি প্রথমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সঙ্গে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নেন, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পক্ষে ফরিদপুরে প্রচারণার নেতৃত্ব দেন এবং পাকিস্তান দাবির পক্ষে জনমত সংগঠিত করেন। পরে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর একই তরুণ নেতা বাংলা ভাষা, পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অধিকার এবং পরবর্তী সময়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবির আন্দোলনে ক্রমে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসেন।
ফলে “বঙ্গবন্ধু জিন্নাহর নির্বাচনে কাজ করেছিলেন”—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের বদলে ইতিহাসসম্মতভাবে বলা অধিক যথাযথ যে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির পক্ষে এবং বৃহত্তর ফরিদপুরে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বই রেফারেন্স: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, UPL।
বই রেফারেন্স: Ian Talbot, Pakistan: A Modern History।
রেফারেন্স: বাংলাপিডিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনী।
এই ইতিহাস বর্তমান ডাকসু বিতর্ককেও আরও জটিল করে তোলে। জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আছেন, কিন্তু তিনি সেখানে শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উপস্থিত নন। তিনি এমন একজন রাষ্ট্রনেতা হিসেবেও ইতিহাসে আছেন, যার উর্দুকেন্দ্রিক ভাষানীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন।
অন্যদিকে শেখ মুজিবকেও ১৯৪৬ সালের পাকিস্তান আন্দোলনের অধ্যায় বাদ দিয়ে শুধু পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক জীবনের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
ইতিহাসের ব্যক্তিদের অবস্থান সব সময় একই জায়গায় স্থির থাকে না। ঔপনিবেশিক ভারত, পাকিস্তান আন্দোলন, দেশভাগ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী বাঙালি স্বাধিকার আন্দোলন—প্রতিটি পর্যায়ে রাজনৈতিক জোট, দাবি এবং লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়েছে।
সেই কারণেই জিন্নাহ ও শেখ মুজিবের ইতিহাসের সংযোগটি একই সঙ্গে সহযোগিতা, রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং পরবর্তী বিরোধের ইতিহাস।
১৯৪৬ সালে শেখ মুজিব যে মুসলিম লীগের বিজয়ের জন্য মাঠে কাজ করেছিলেন, সেই দলের সর্বভারতীয় নেতা ছিলেন জিন্নাহ। কিন্তু ১৯৪৮ সালে যখন জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান নেন, তখন শেখ মুজিব বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনকারী তরুণ নেতাদের একজন। দুই বছরের ব্যবধানে এই পরিবর্তন পূর্ববাংলার রাজনীতির দ্রুত রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৩ মাসের মতো সময় তিনি নতুন রাষ্ট্রটির গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত, ভাষণ এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—তিন দেশের ইতিহাসেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।
বাংলাদেশে জিন্নাহকে ঘিরে বিতর্কও তাই শুধু একজন মৃত রাষ্ট্রনায়কের ছবি নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাকিস্তান আন্দোলনের উত্তরাধিকার, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক বিবর্তন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং অতীতকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—এই বৃহত্তর প্রশ্ন।
২০২৬ সালের ডাকসু সংগ্রহশালা বিতর্ক সেই পুরোনো ইতিহাসকে আবার সামনে এনেছে। এক পক্ষ বলছে, ইতিহাসের নেতিবাচক চরিত্র বা বিতর্কিত অধ্যায়ও প্রেক্ষাপটসহ সংগ্রহশালায় থাকতে পারে। অন্য পক্ষ বলছে, বাংলাদেশের ভাষা ও স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে তুলে না ধরে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ইতিহাসের ভারসাম্য নষ্ট করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অবস্থান জানিয়েছে।
এই বিতর্কের মাঝেই একটি বিষয় পরিষ্কার—মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। একইভাবে তার ইতিহাসকে শুধু একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করেও বোঝা কঠিন।
তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, এক সময়ের হিন্দু-মুসলিম সমঝোতার রাজনীতিক, পরবর্তীকালের দ্বিজাতিতত্ত্বভিত্তিক পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা, ১৯৪৬ সালে শেখ মুজিবসহ বহু বাঙালি মুসলিম লীগ কর্মীর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র এবং একই সঙ্গে ১৯৪৮ সালে বাংলার রাষ্ট্রভাষার দাবির বিরোধিতাকারী পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল।
এই বহুস্তরীয় ইতিহাসই আজও জিন্নাহকে নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা, প্রশ্ন এবং বিতর্ককে জীবন্ত রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - জীবনী
- কারাগারেই জন্ম, ৭ বছর পর মায়ের হাত ধরে মুক্ত মোবাশ্বেরা
- জিন্নাহ-শেখ মুজিব সম্পর্কের অজানা অধ্যায়, কী হয়েছিল ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে?
- প্রাক্তনকে বারবার মনে পড়ছে? যেসব উপায়ে ভুলতে পারবেন
- নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চলবে বৈদ্যুতিক ট্রেন, ব্যয় ৩৮২২ কোটি
- আমির হামজার বিরুদ্ধে মানহানি মামলার হুঁশিয়ারি ফরিদা ইয়াসমিনের
- আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামতে যাচ্ছেন মেসি
- হুথি সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব: প্রতিবেদন
- একনেক সভায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার ১৬ প্রকল্প, মেট্রোরেলেই ৪৫ হাজার কোটি
- কারাগারেই মায়ের আদ্যশ্রাদ্ধ করতে চান চিন্ময় কৃষ্ণ দাস
- বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ ছাড়ছেন সালমান এফ রহমান
- রাজ্জাক দেওয়ান স্মরণে গাইবেন বগা তালেবসহ ১৫ শিল্পী
- মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়: জামায়াত আমির
- ভারতে ‘ভূত আতঙ্কে’ হোস্টেল ছাড়ল ৬০০ শিক্ষার্থী, চিকিৎসকদের ভিন্ন ব্যাখ্যা
- ডা. তাসনিম জারা: শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও রাজনীতি
- ফের ‘জান্নাত’ নিয়ে আসছেন ইমরান হাশমি, আসছে ‘জান্নাত ৩’
- হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান
- আওয়ামী লীগের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে জামায়াত: রাশেদ খান
- আখ চাষে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য, খুলছে বাড়তি আয়ের পথ
- এনবিআর ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে: অর্থমন্ত্রী
- পাকিস্তানের হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু




