• মঙ্গলবার , ২৫ আগস্ট, ২০২৬ | ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনে মাংসের লোভে শিকার হচ্ছে বন্য হাতি!

সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনে মাংসের লোভে শিকার হচ্ছে বন্য হাতি!

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪:০০ ১৮ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশে দাঁতের জন্য নয়, এবার মাংসের লোভেও শিকার হচ্ছে বন্য হাতি। মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলের সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে মাংসের উদ্দেশ্যে হাতি হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন একদল গবেষক। এটি দেশের ইতিহাসে হাতি শিকারের এক নতুন ও ভয়াবহ দিক উন্মোচন করেছে।

চার সদস্যের একটি গবেষক দল এ বছরের এপ্রিল মাসে সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে গবেষণা পরিচালনা করেন। সেখানে তারা একটি মাচায় হাতির মাংস শুকানোর চিহ্ন পান। ৩৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট উচ্চতার সেই মাচার ওপর পাওয়া যায় হাতির মাংসের শুকনো টুকরো, হাড় এবং চামড়া। গবেষকদের ধারণা, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি হত্যা করে এসব অংশ শুকানো হচ্ছিল। তাদের প্রতিবেদনটি ১৬ অক্টোবর কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, ঘটনাস্থলটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এলাকা। স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে হাতি হত্যার এমন আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এতে সন্দেহ করা হচ্ছে, হাতির মাংস ছাড়াও হাড় ও দাঁত মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতিবিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, “এটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। পার্বত্য অঞ্চলে হাতির মাংস খাওয়ার প্রথা বহু পুরনো। আমরা আগে শুনেছি, কিন্তু এবার সেটির প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল।” তিনি আরও জানান, ২০১৯ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে মিয়ানমারে মাংসের জন্য হাতি হত্যার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মোট ১১৪টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে গুলি করে ৭টি, বিদ্যুতের ফাঁদে ২৬টি, দুর্ঘটনায় ১৮টি, অসুস্থতায় ৪০টি, বয়সজনিত কারণে ১৫টি ও অজ্ঞাত কারণে ১০টি হাতি মারা পড়ে। কিন্তু এতসব মৃত্যুর পরেও বন আদালতে মামলা হয়েছে মাত্র ১৯টি।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বরাত দিয়ে গবেষক দল জানিয়েছে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র হাতি শিকার ও পাচারে যুক্ত। এদিকে, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে মিয়ানমার থেকে হাতির নিয়মিত আসা-যাওয়ার প্রমাণও পেয়েছেন গবেষকরা। গবেষণায় দেখা গেছে, সাঙ্গু-মাতামুহুরী বন এখনো তুলনামূলক অক্ষত এবং হাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে রয়েছে; তাই এই এলাকায় হাতি শিকার নতুন এক আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

বন বিভাগের ‘হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা ২০১৮-২০২৭’-এ উল্লেখ রয়েছে, হাতির দাঁত ও দেহাংশের পাচার বাংলাদেশে হাতির অস্তিত্বকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলছে। আইইউসিএনের সর্বশেষ জরিপে (২০১৬) দেশে মাত্র ২৬৮টি বন্য হাতির অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল, যা এখন আরও কমে আসার আশঙ্কা করছে সংরক্ষণবিদরা।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে হাতি হত্যা একটি গুরুতর অপরাধ। এই অপরাধে সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

গবেষকদের মতে, এই প্রথম বাংলাদেশে মাংসের জন্য হাতি হত্যার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেল, যা শুধু দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

বিজ্ঞাপন