• বৃহস্পতিবার , ২০ আগস্ট, ২০২৬ | ৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ছাঁটাইয়ের শঙ্কা

গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ছাঁটাইয়ের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২:৫৭ ২০ আগস্ট ২০২৬

তীব্র গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার গ্যাসনির্ভর বেশ কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। এতে প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।

কারখানা সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই বা জনবল কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছেন কয়েকটি কারখানার কর্মকর্তারা।

গ্যাসের চাপ কমে বন্ধ কারখানার উৎপাদন

আশুলিয়ার কাঠগড়া আমতলা এলাকায় ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এ আর ও ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেডে কয়েক সপ্তাহ ধরে কম সক্ষমতায় উৎপাদন চলছিল। পরে বুধবার রাতের পর বৃহস্পতিবার সকালে কারখানাটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

সরেজমিনে কারখানাটির তিনটি সেকশনের কার্যক্রম বন্ধ দেখা যায়। ভেতরে শ্রমিকদের উপস্থিতিও ছিল না। নিরাপত্তারক্ষী ও কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে অবস্থান করছিলেন।

কারখানার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকট শুরুর পর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একপর্যায়ে উৎপাদন সক্ষমতা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ হাজার পিস। বাইরে থেকে গ্যাস এনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এরপরও কারখানার একটি অংশ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

প্রয়োজন ১০ পিএসআই, পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ২.৫

কারখানাটির ড্রাই প্রসেস, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কোয়ালিটি সেকশনে ৮০ থেকে ৯০টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সরেজমিনে কারখানাটির গ্যাস মিটারে চাপ পাওয়া যায় ২.৫ পিএসআই। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে কমপক্ষে ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন।

তবে বর্তমানে গ্যাসের চাপ শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ২.৫ পিএসআইয়ের মধ্যে ওঠানামা করছে। কখনো চাপ পাওয়া গেলেও গ্যাসের মান যথাযথ না থাকায় তা উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিকল্প গ্যাস আনতে বাড়ছে খরচ

ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কোম্পানি সচিব আরএকে লিটন জানান, তাদের ওয়াশিং প্ল্যান্টে উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

সংকট মোকাবিলায় বাইরে থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও তাতে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এভাবে উৎপাদন চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, দিনের প্রায় অর্ধেক সময় কারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্য থাকে। সাভার-আশুলিয়ার গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানাই একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

১৫ দিন ধরে বন্ধ টেক্সটাইল কারখানা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিজা গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের টেক্সটাইল কারখানা টানা ১৫ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

তার দাবি, এতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকা করে লোকসান হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তারক্ষীরাও জানিয়েছেন, বর্তমানে ভেতরে কোনো শ্রমিক নেই।

বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক কারখানার গেটে এলেও তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

দিনে ১১ কোটি টাকা লোকসানের দাবি

রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ পিয়াল জানান, তাদের ডাইং কারখানা কাগজে-কলমে চালু থাকলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় কার্যত উৎপাদন হচ্ছে না।

তার ভাষ্য, কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে মেশিন চালু করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই চাপ কমে যায়। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কারখানাটিতে প্রায় ৯৭৫ জন শ্রমিক কর্মরত। উৎপাদন কমে গেলেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে।

বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে

জামগড়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, বিভিন্ন জ্বালানি উৎস ব্যবহার করেও তাদের মিলকে সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশে চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাসের মাধ্যমে বর্তমানে কোনো উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুতের মাধ্যমে প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদন চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যবহার করে উৎপাদনের কিছু অংশ সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

তবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান তিনি। প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ টাকা খরচ হচ্ছে।

গ্যাসের চাপ সর্বোচ্চ ১ থেকে ১.৫ পিএসআই পর্যন্ত ওঠায় জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

৩০ শতাংশ জনবল কমানোর আশঙ্কা

সংকট মোকাবিলায় লিটল স্টার স্পিনিং মিলে তিন শিফটে উৎপাদন রেশনিং করা হচ্ছে। ছয়টি সেকশনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুটি চালু রাখা হয়েছে।

খোরশেদ আলম বলেন, লোকসান হলেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য সুতা বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটের এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

শিল্প পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন

তবে আশুলিয়ার কারখানা বন্ধের বিষয়ে শিল্প পুলিশের বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন।

শিল্প পুলিশ-১-এর সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, গ্যাস সংকটের কারণে আশুলিয়া অঞ্চলের কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে নেই।

তিনি বলেন, মুন্নু সিরামিকস এক বা দুই দিন বন্ধ ছিল। এ ছাড়া প্রীতি অ্যাপারেলসসহ আরও একটি কারখানা একই সময়ে সমস্যায় পড়েছিল। তবে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হলে এসব কারখানায় আবার সমস্যা থাকে না বলেও জানান তিনি।

সার্বিক পরিস্থিতি

আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানানো হচ্ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন