• মঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৪ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সবাই করত পরীক্ষার টেনশন, আর আমি টেনশন করতাম পরীক্ষার ফি নিয়ে

সবাই করত পরীক্ষার টেনশন, আর আমি টেনশন করতাম পরীক্ষার ফি নিয়ে

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:২৬ ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

দরিদ্র পরিবারের প্রথম মেয়েসন্তানদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে নিতে আইডিএলসি ও প্রথম আলো ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে দেওয়া হয় ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। এই বৃত্তির আওতায় সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মেধাবী মেয়েরা চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) পড়ার সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের জন্য আবাসন, টিউশন ফি মওকুফসহ নানা সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করে থাকে।

২০১২ সাল থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহযোগিতায় ৪২ জন এবং ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির সহযোগিতায় আরও ৮৬ জন—মোট ১২৮ জন ছাত্রী এ পর্যন্ত এই বৃত্তি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৭৬ জন ইতিমধ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং অনেকেই দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভালো অবস্থানে আছেন। ২০২৫ সালেও এই বৃত্তি পেয়েছেন ১০ জন শিক্ষার্থী। তাঁদেরই একজন মৌলভীবাজারের ইটা চা–বাগানের মেয়ে হুসনে আরা।

হুসনে আরা বলেন, তাঁর চা–বাগান থেকে আগে কখনো কোনো মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেনি। ২০১৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও ভারী হয়ে পড়ে। মা দিনভর মাটির টিলা বয়ে সংসার চালান। মেয়েকে পড়াশোনা করাতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, “রক্ত বিক্রি করে হলেও তোদের পড়াব।” এই কথাগুলো আজও হুসনে আরার কানে বাজে।

স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণ করে হুসনে আরা বলেন, অন্যরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তিত থাকলেও তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল পরীক্ষার ফি জোগাড় করা নিয়ে। পরীক্ষার সময় এলেই মনে হতো, ফি দিতে পারব তো? বাবার অভাব আর আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁকে প্রতিটি ধাপে লড়াই করতে শিখিয়েছে।

পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় নানুর জমি বিক্রির টাকা আর ঋণ নিয়ে তাঁর ভাইকে একটি সিএনজি গাড়ি কিনে দেওয়া হয়। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো দুঃখের দিন শেষ হবে। ঠিক সেই সময়, ২০ জুন এইউডব্লিউতে ভর্তি পরীক্ষা দেন হুসনে আরা। কিন্তু ২৬ জুন, কিস্তির টাকা শোধ করার আগেই সিএনজি গাড়িটি চুরি হয়ে যায়। সেই দিন মায়ের অসহায় কান্না আজও তাঁর চোখে ভাসে।

সব প্রতিকূলতার মাঝেও এইউডব্লিউতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া হুসনে আরা ও তাঁর পরিবারের জন্য নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। বর্তমানে তাঁর ভাই মাঝেমধ্যে এক আত্মীয়ের মিনি পিকআপ ভ্যান চালিয়ে সামান্য আয় করেন, যা দিয়ে নিজের খরচ আর ছোট বোনের কিছু প্রয়োজন মেটান।

হুসনে আরার সবচেয়ে বড় চিন্তা এখন তাঁর ছোট বোনকে ঘিরে। তিনি চান না, বোনকেও তাঁর মতো দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হোক। এই পথ সহজ করতে অদ্বিতীয়া বৃত্তিকে তিনি মনে করেন এক শক্ত ভরসার জায়গা। তাঁর আশা, এই বৃত্তির মাধ্যমে তিনি স্বাবলম্বী হয়ে উঠবেন এবং আর মায়ের কাছে হাতখরচ চাইতে হবে না।

ইটা চা–বাগানের মেয়ে হুসনে আরার এই সংগ্রামের গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত মেয়ের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/