• মঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল কি শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ? নতুন গবেষণায় মিলল স্বস্তির খবর

গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল কি শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ? নতুন গবেষণায় মিলল স্বস্তির খবর

সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১১:৫০ ২০ জানুয়ারী ২০২৬

গর্ভাবস্থায় মায়েদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি হলো—কোন ওষুধ কতটা নিরাপদ। সামান্য জ্বর বা ব্যথাতেও ওষুধ খাওয়ার আগে বারবার ভাবতে হয়, এতে অনাগত শিশুর কোনো ক্ষতি হবে কি না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের মধ্যে অটিজম, এডিএইচডি (ADHD) ও বিভিন্ন আচরণগত সমস্যার সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। অনেক মা-বাবার মনেই প্রশ্ন, গর্ভাবস্থায় নেওয়া কোনো ওষুধ কি এসব সমস্যার জন্য দায়ী? এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই প্যারাসিটামল নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক।

এই উদ্বেগের পেছনে রয়েছে কিছু গবেষণা ও সামাজিক আলোচনার প্রভাব। কয়েক বছর আগে এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত প্যারাসিটামল সেবন করলে শিশুর অটিজম বা এডিএইচডিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আমেরিকার আইকাহন স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাইসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা পর্যবেক্ষণমূলক কিছু গবেষণার ভিত্তিতে এই সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে এই উদ্বেগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই আশঙ্কাকে অনেকটাই খারিজ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গবেষণা। চিকিৎসা ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রভাবশালী সাময়িকী ল্যানসেট অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি-তে প্রকাশিত এক বড় গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায় মায়ের প্যারাসিটামল সেবনের সঙ্গে শিশুর অটিজম, এডিএইচডি বা বুদ্ধিবিকাশজনিত সমস্যার কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এই গবেষণা নতুন করে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে গর্ভবতী মায়েদের জন্য।

গবেষণায় বিশাল পরিসরে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অটিজমের ঝুঁকি যাচাই করতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ২ লাখ ৬২ হাজারের বেশি শিশু। এডিএইচডির ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা হয় ৩ লাখ ৩৫ হাজারেরও বেশি শিশুর তথ্য। পাশাপাশি প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার শিশুর বুদ্ধিবিকাশজনিত সমস্যার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়। এত বড় সংখ্যক শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করার পর গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান—গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল গ্রহণ এসব সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায় না।

এখানে অটিজম ও এডিএইচডি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হলো মস্তিষ্কের বিকাশজনিত একটি অবস্থা, যেখানে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, আচরণ ও অনুভূতি প্রকাশে ভিন্নতা দেখা যায়। অন্যদিকে এডিএইচডি একটি স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা, যার ফলে মনোযোগ ধরে রাখা, অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়। এসব সমস্যার পেছনে জিনগত, পরিবেশগত ও জটিল নানা কারণ কাজ করে, যা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় যেকোনো ওষুধই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত। তবে জ্বর বা ব্যথার ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল দীর্ঘদিন ধরেই গর্ভাবস্থায় তুলনামূলক নিরাপদ ওষুধ হিসেবে বিবেচিত। ল্যানসেট অবস্টেট্রিকস-এর এই গবেষণা সেই ধারণাকেই আরও জোরালোভাবে সমর্থন করেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গর্ভাবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী এবং চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল সেবন করলে তা শিশুর অটিজম বা এডিএইচডির ঝুঁকি বাড়ায়—এমন কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। অযথা ভয় বা গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতন থাকা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলাই মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/