• শনিবার , ০৪ জুলাই, ২০২৬ | ১৯ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৭ বছরের কারাজীবন পেরিয়ে রাজনীতিতে বাবরের প্রত্যাবর্তন

১৭ বছরের কারাজীবন পেরিয়ে রাজনীতিতে বাবরের প্রত্যাবর্তন

১৭ বছরের কারাজীবন পেরিয়ে রাজনীতিতে বাবরের প্রত্যাবর্তন

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৩৩ ৩ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে লুৎফুজ্জামান বাবর একটি আলোচিত নাম। কেউ তাকে দেখেন দৃঢ়চেতা বিএনপি নেতা হিসেবে, কেউ আবার দেখেন বিতর্কিত সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের কারাজীবন, একাধিক মামলায় খালাস, এবং পরে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে তার জীবন এক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের গল্প।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

লুৎফুজ্জামান বাবর ১৯৫৮ সালের ১০ অক্টোবর নেত্রকোনার একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক শিকড় নেত্রকোনায় হলেও বেড়ে ওঠার বড় অংশ কেটেছে ঢাকায়। রাজনীতির সঙ্গে তার পরিবারের পরিচিতি ও সামাজিক যোগাযোগ তাকে ছোটবেলা থেকেই ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

পড়াশোনা ও শিক্ষাজীবন

বাবরের শিক্ষাজীবন নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কিছু গণমাধ্যমে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এইচএসসি পর্যন্ত বলা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা বা বিদেশে পড়াশোনা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায় না, তাই এ অংশে অতিরঞ্জিত দাবি করা ঠিক হবে না।

রাজনীতিতে প্রবেশ

বাবরের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। তিনি ১৯৯১ সালে নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০১ সালেও একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপি আমলে ভূমিকা

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বাবর ছিলেন বিএনপি সরকারের অন্যতম আলোচিত মুখ। তার সময়েই র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র‍্যাব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। একই সময়ে জঙ্গিবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলা ভাইসহ জেএমবি নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও তার দায়িত্বকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আলোচিত।

ভারত ইস্যুতে অবস্থান

বাবরকে তার সমর্থকেরা জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেন। বিশেষ করে সীমান্ত, চোরাচালান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে এই অংশে অনেক বক্তব্যই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও সমর্থকগোষ্ঠীর মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল, তাই নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে—তিনি বিএনপি আমলে নিরাপত্তা নীতির কঠোর ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।

মামলা, কারাজীবন ও অন্ধকার অধ্যায়

২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পর বাবরের জীবনে শুরু হয় দীর্ঘ কারাজীবন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়, যার মধ্যে দুর্নীতি মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা এবং ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ছিল সবচেয়ে আলোচিত। বছরের পর বছর কারাগারে থাকার কারণে তার সমর্থকেরা এই সময়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ‘অন্ধকার কারাজীবন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তবে আইনি দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে তিনি একাধিক মামলায় খালাস পান। ২০২৪ সালে দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্ট তাকে খালাস দেন। একই বছর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়ও তার খালাসের আদেশ আসে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অস্ত্র আইনের অংশেও তিনি খালাস পান।

মুক্তি ও রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ ১৭ বছর কারাভোগের পর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি লুৎফুজ্জামান বাবর কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির সময় তার সমর্থকেরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সব মামলায় খালাস পাওয়ার পরই তার মুক্তির পথ তৈরি হয়।

মুক্তির পর বাবর আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। তিনি ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ভোট পান।

নতুন অধ্যায়ের শুরু

কারামুক্তির পর বাবরের রাজনীতিতে ফেরা তার সমর্থকদের কাছে এক ধরনের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। তারা মনে করেন, দীর্ঘ কারাবাস তাকে থামাতে পারেনি; বরং নতুন করে রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছে। অন্যদিকে তার সমালোচকেরা তার অতীত দায়িত্বকাল ও বিতর্কিত ঘটনাগুলো নিয়ে এখনও প্রশ্ন তোলেন। এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের মাঝেই বাবরের বর্তমান রাজনৈতিক অধ্যায় এগিয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার

লুৎফুজ্জামান বাবরের জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির এক জটিল অধ্যায়। শৈশব থেকে রাজনীতিতে উত্থান, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব, মামলা, দীর্ঘ কারাজীবন, খালাস এবং পুনরায় সংসদীয় রাজনীতিতে ফেরা—সব মিলিয়ে তার জীবন কেবল একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ক্ষমতা, বিচার, প্রতিহিংসা, বিতর্ক ও প্রত্যাবর্তনের রাজনীতিরও প্রতিচ্ছবি।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/