সংসারের স্বার্থে পড়াশোনা ছেড়েছিলেন, ৫৪ বছরে জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে এসএসসি পাস


প্রকাশিত: ১১:২০ ১১ আগস্ট ২০২৬
‘বয়স কেবল একটি সংখ্যা’—ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের কোনো বাধাই যে স্বপ্ন পূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না, তা প্রমাণ করেছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর। জীবনের দীর্ঘ সময় সংসারের অভাব-অনটন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রামে কাটানোর পর ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
আলী আকবর বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার বাসিন্দা। স্থানীয়ভাবে তিনি আলী আজম নামেও পরিচিত। ছোটবেলায় দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তাকে। তবে বহু বছর পর নিজের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছা আবার জেগে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই সফল হন তিনি।
ছোটবেলায়ই পড়াশোনায় ছেদ
আলী আকবর জানান, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ছোটবেলাতেই পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে।
পরবর্তী সময়ে বিয়ে করেন তিনি। সংসারে আসে এক মেয়ে ও এক ছেলে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের লেখাপড়ার স্বপ্নকে একসময় পুরোপুরি পাশে সরিয়ে রাখেন।
সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতেই কেটে যায় জীবন
সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন আলী আকবর। একপর্যায়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী পদে চাকরি শুরু করেন। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জনের অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন।
তার বড় মেয়ে বর্তমানে নার্সিং পেশায় যুক্ত। আর ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।
সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারার পরই নিজের বহু বছরের পুরোনো স্বপ্নের কথা নতুন করে মনে পড়ে আলী আকবরের।
৫৪ বছর বয়সে আবার স্কুলে ভর্তি
আলী আকবর বলেন, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। মেয়েকে নার্স এবং ছেলেকে ডাক্তার বানানোর পর তারা নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের বাকি সময়টুকু বসে না থেকে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নটিও পূরণ করবেন।
চাকরির সুবাদে রাজশিয়ায় অবস্থানকালে নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখায় ভর্তি হন তিনি। এরপর নিয়মিত পড়াশোনা করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।
প্রথমবারেই জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আনন্দ প্রকাশ করে আলী আকবর বলেন, প্রথমবারেই সফল হওয়ায় তার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
শিক্ষার্থীদের জন্য আলী আকবরের বার্তা
বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পড়াশোনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হলে মনোবল, মনোযোগ এবং পরিশ্রম প্রয়োজন।
তিনি শিক্ষার্থীদের অযথা মোবাইল গেম ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। নিজের জীবনকেই এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ইচ্ছা ও পরিশ্রম থাকলে সফল হওয়া সম্ভব।
বাবার স্বপ্ন পূরণে পাশে ছিলেন সন্তানরা
আলী আকবরের ছেলে ডাক্তার ইসমাইল হোসেন জানান, তার বাবা প্রায়ই বলতেন, ছোটবেলা থেকেই তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটন এবং সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বের কারণে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি।
বাবার সেই অপূর্ণ স্বপ্নের কথা সন্তানরা জানতেন। তাই তারাই তাকে আবার স্কুলে ভর্তি হতে উৎসাহিত করেন।
ইসমাইল হোসেন জানান, তিনি নিজে একজন চিকিৎসক এবং তার স্ত্রীও চিকিৎসক। বড় বোন নার্সিং পেশায় যুক্ত এবং বোন জামাই শিক্ষকতা করছেন। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পর বাবা যে স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটবেন, সেটিই তারা চেয়েছিলেন।
এবার এসএসসি পাস করার পর আলী আকবরকে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করানোর ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তার ছেলে। একই সঙ্গে বাবার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
এলাকায় তৈরি হয়েছে অনুপ্রেরণা
৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাসের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও তার এই সাফল্যকে গর্বের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
পেড়াবাড়িয়া মহল্লার সাবেক কমিশনার আবু হেনা মো. কামরুজ্জামান বলেন, এই বয়সে পড়াশোনা শুরু করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া আলী আকবরের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ।
তার মতে, আলী আকবরের এই সাফল্য শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার। পেড়াবাড়িয়া মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানানো হয়েছে।
আলী আকবরের গল্প যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—জীবনের কোনো পর্যায়েই স্বপ্নের জন্য দেরি হয়ে যায় না। দায়িত্ব ও বাস্তবতার কারণে কোনো স্বপ্ন থেমে গেলেও সুযোগ পেলে সেটিকে নতুন করে শুরু করা সম্ভব। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করে সেই বার্তাই দিয়েছেন নাটোরের এই অদম্য মানুষ।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - দেশজুড়ে
- সাভারের বনগাঁওয়ে তিন দিনব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম শুরু
- অসংখ্য ডিসেম্বর আসবে-যাবে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন না: রাশেদ খাঁন
- জাতীয় দলের শিবির ছাড়ায় ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে রোনালদো
- রিয়াদ বিমানবন্দরে তৃতীয় দফা হামলার দাবি হুথিদের, ক্ষতিগ্রস্ত বিমান
- পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবি, চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ ডলার
- মেসির বিদায়ে রোনালদোর আবেগঘন বার্তা, জানালেন ‘পূর্ণ শ্রদ্ধা’
- ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ট্রাম্পের নগ্ন ভাস্কর্য ‘অরেঞ্জ প্লেগ’
- ৮ মাস পর চালু, দুই দিনের মাথায় ফের বন্ধ যমুনা সার কারখানা
- রজনীকান্তের ‘জেলার ২’ থেকে বাদ ১০০ মিনিটের বেশি দৃশ্য
- শেষ ম্যাচে গোল-অ্যাসিস্ট, সতীর্থদের ভালোবাসায় বিদায় মেসির
- মাছ, মুরগি ও ডিমের বাজারে স্বস্তি নেই, বেকায়দায় নিম্নবিত্তরা
- নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম আবার বাড়ল, ১০ শলাকা এখন ৬৫ টাকা
- প্রেম, অভিমান আর ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’: রুদ্র–তসলিমার অজানা গল্প
- র্যাব বিলুপ্ত, যাত্রা শুরু এসআরবির; বদলাবে পোশাক-লোগো-যানবাহনের রং
- বাংলাদেশ দলে কাটছাঁট, আসিয়ান কাপের স্কোয়াড থেকে বাদ ৬ ফুটবলার
- ‘জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন, তিনি ছিলেন হিন্দু’: ফজলুর রহমানের দাবি, ইতিহাস কী বলে
- জামানত ছাড়াই ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবেন যেসব তরুণ উদ্যোক্তা
- মেসির রেকর্ড ছুঁলেন রাফিনিয়া, ৭ গোলের রাতে ইতিহাস গড়ল বার্সেলোনা
- বাংলাদেশের কূটনীতি ও রাজনীতিতে আলোচিত নাম সাকিব আলী
- বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধাক্কা, পরিবার আনার সুযোগ সীমিত করছে অস্ট্রেলিয়া




