আবারও ন্যায্য মজুরি আদায়ের দাবিতে সড়ক অবরোধ গার্মেন্টস শ্রমিকদের


প্রকাশিত: ০৩:০১ ২৯ অক্টোবর ২০২৬
একদিকে দেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের বিশাল অবদান, অন্যদিকে সেই শিল্পের শ্রমিকদের জীবনযাত্রা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও বসবাসের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান নিয়ে আমরা গর্ব করি। সর্বশেষ প্রকাশিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। ওই বছর চীন প্রায় ১৬৫.২৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, আর বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৮.৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে শ্রমিকদের পরিশ্রমে এই শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, তাঁদের জীবনে এই সাফল্যের প্রতিফলন কতটুকু?
আজও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করতে হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে সড়ক অবরোধের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে যানজট সৃষ্টি হয়েছে, ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আমরা কি শুধু যানজটটাই দেখব, নাকি এর পেছনের কারণগুলোও বোঝার চেষ্টা করব?
একজন শ্রমিক যখন নিজের ন্যায্য মজুরির দাবিতে বারবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হন, তখন প্রশ্ন ওঠে—সমস্যাটা কোথায়? কেন এমন একটি শিল্পের শ্রমিককে নিজের ও পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার নিশ্চয়তার জন্য বারবার আন্দোলন করতে হয়?
চীন প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয়—তবু মজুরিতে এত পার্থক্য কেন?
বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতের প্রবেশপর্যায়ের শ্রমিকের আইনগত ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২০২৩ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২,৫০০ টাকা। বর্তমান বিনিময় হারে এটি প্রায় ১০০ ডলারের সমান। অবশ্য শ্রমিকের গ্রেড, অভিজ্ঞতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য ভাতার কারণে প্রকৃত আয় আলাদা হতে পারে। অন্যদিকে, চীনে ন্যূনতম মজুরি অঞ্চলভেদে নির্ধারিত হয়। ২০২৫ সালের একটি শিল্পভিত্তিক প্রতিবেদনে গুয়াংসির মতো অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ের অঞ্চলে মাসিক ন্যূনতম মজুরি প্রায় ২৬২ ডলার এবং সাংহাইয়ে প্রায় ৩৮৫ ডলারের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। এগুলো চীনের নির্দিষ্ট অঞ্চলের ন্যূনতম মজুরি; সব গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রকৃত বেতন নয়।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশও যখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক, তখন শ্রমিকের মজুরি কেন তুলনামূলকভাবে এত কম থাকে?
এর পেছনে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, শ্রমিকের দর-কষাকষির ক্ষমতা, শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণের মতো একাধিক বিষয় কাজ করে। চীনের শিল্পব্যবস্থা, অবকাঠামো ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে কম উৎপাদন খরচের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
কিন্তু এই প্রতিযোগিতার খরচ যদি বারবার শ্রমিকের ওপর চাপানো হয়, তাহলে দেশের রপ্তানি বাড়লেও শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান সেই অনুপাতে বাড়বে না।
এখানে একটি তথ্যগত বিষয়ও পরিষ্কার করা প্রয়োজন: বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বিশ্বের সব দেশের মধ্যে নিশ্চিতভাবে সর্বনিম্ন—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন মজুরির দেশগুলোর একটি; কোন দেশকে তুলনায় নেওয়া হচ্ছে এবং কোন বছরের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বে মালিক-শ্রমিকের এই দ্বন্দ্ব
তাহলে চলুন, এবার জেনে নেওয়া যাক,সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্সের শ্রেণিসংঘাত তত্ত্ব।যা দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, সমাজে উৎপাদনের উপকরণ ও মূলধনের মালিকানা এবং শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
গার্মেন্টস শিল্পে মালিকের হাতে থাকে কারখানা, মূলধন, উৎপাদনব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে, শ্রমিক নিজের শ্রম ও সময় দিয়ে পোশাক তৈরি করেন। কিন্তু তিনি সাধারণত পণ্যের বিক্রয়মূল্য, আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেন না।
আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চায়, কারখানাগুলো অর্ডার ধরে রাখতে চায়, আর মালিকপক্ষ উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে শ্রমিকের মজুরি কম রাখার চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে শ্রমিকের শ্রমে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হলেও সেই অর্থনৈতিক সাফল্যের সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয় না।
এখানে সব মালিক ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিককে দরিদ্র রাখতে চান—এমন দাবি করা হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোটি কি শ্রমিকের ন্যায্য জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার মতো করে তৈরি হয়েছে?
যদি একজন শ্রমিকের আয় শুধু বেঁচে থাকার খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর পক্ষে সঞ্চয় করা, নিজের দক্ষতা বাড়ানো, সন্তানদের উন্নত শিক্ষা দেওয়া কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবেই অর্থনৈতিক বৈষম্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে চলতে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শ্রমিকের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি এই বৈষম্যের মধ্যেই আটকে থাকবে?
একটি পরিবারের কথা চিন্তা করুন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন। তাঁদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়। মাস শেষে পাওয়া আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, পানি এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে হয়।
বর্তমান বাজারদরে এই খরচগুলো মেটানোই যখন কঠিন, তখন সন্তানকে ভালো পুষ্টি, পর্যাপ্ত পড়াশোনার পরিবেশ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা এবং মানসিক বিকাশের সুযোগ কীভাবে দেওয়া সম্ভব?
শুধু স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই একটি শিশুর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। তার প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, পড়ার উপযোগী জায়গা, মা-বাবার সময় ও দিকনির্দেশনা এবং আর্থিক নিরাপত্তা। কিন্তু মা-বাবা দুজনই যদি দীর্ঘ কর্মঘণ্টার পর ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন এবং তাঁদের আয়ও সীমিত থাকে, তাহলে সন্তানকে এসব সুযোগ দেওয়া আরও কঠিন হয়ে যায়।
এর মানে এই নয় যে শ্রমিকের সন্তান ভালো করতে পারবে না। বরং একই মেধা ও পরিশ্রম থাকা সত্ত্বেও একটি সচ্ছল পরিবারের সন্তান যে সুযোগ পায়, শ্রমিকের সন্তান সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিশু পর্যাপ্ত শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ পায় না, তার সামনে ভবিষ্যতে কী ধরনের কর্মসংস্থানের পথ খোলা থাকবে? সে যদি পরবর্তী সময়ে একই ধরনের কম মজুরির কাজে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়, তাহলে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে কীভাবে?
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য তো শুধু বেশি পণ্য উৎপাদন কিংবা বেশি রপ্তানি করা নয়। সেই উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান, শিক্ষার সুযোগ এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎও উন্নত হওয়ার কথা।
বস্তিতে বসবাস, পরিবেশদূষণ এবং পরিবেশগত বৈষম্য
এবার আসা যাক শ্রমিকদের বসবাসের পরিবেশের বিষয়ে।
কম আয়ের কারণে অনেক শ্রমিককে কারখানার কাছাকাছি ঘনবসতিপূর্ণ নিম্ন আয়ের এলাকায় বা বস্তিতে বসবাস করতে হয়। সবার বাসস্থান এক রকম নয়, কিন্তু যাঁরা এমন এলাকায় থাকেন, তাঁদের অনেককে ছোট ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ ঘর, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস, দুর্বল পয়োনিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং নিরাপদ পানির সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
একটি পরিবার কেন এমন পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হয়? অনেক ক্ষেত্রেই কারণটি হলো, তাঁদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বাসস্থান পাওয়া কঠিন।
এখানে পরিবেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তাঁরা তুলনামূলক ভালো বাসস্থান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও উন্নত নাগরিক সুবিধা বেছে নিতে পারেন। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের সামনে সেই বিকল্প সীমিত থাকে।
পরিবেশের সমাজবিজ্ঞান আমাদের শেখায়, পরিবেশদূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি সমাজের সব শ্রেণির ওপর সমানভাবে পড়ে না। অনেক সময় দরিদ্র মানুষ একই সঙ্গে দূষিত বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের ক্ষতি বহন করেন, আবার সেই পরিবেশ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের কম থাকে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নোংরা নালা, জলাবদ্ধতা কিংবা অপরিকল্পিত বসতির কারণে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এর দায় শুধু শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। শ্রমিকের বসবাসের জায়গায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বর্জ্য সংগ্রহ, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, নগর পরিকল্পনাবিদ, বাড়ির মালিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব।
একইভাবে, কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, অপরিশোধিত পানি কিংবা উৎপাদনজনিত দূষণের দায় নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা আলাদাভাবে দেখতে হবে।
অর্থাৎ, শ্রমিকের কম আয় শুধু তাঁর খাবার বা বাসস্থানের সমস্যা তৈরি করে না; এটি তাঁর স্বাস্থ্য, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর সমস্যার অংশ।
যে মানুষ প্রতিদিনের খাবার ও বাসাভাড়া জোগাড় করতেই হিমশিম খান, তাঁর কাছে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন অনেক সময় অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হলে প্রথমে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বাস্তবসম্মত সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের আন্দোলন, যানজট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির দায় কার?
শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে যখন রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না, শিক্ষার্থীদের সমস্যা হয়, ব্যবসায়িক ক্ষতি হয় এবং জরুরি রোগী বা অ্যাম্বুলেন্সের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।

এই ভোগান্তিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আবার শুধু যানজট দেখে শ্রমিকদের দাবিকে অযৌক্তিক বলাও সমস্যার পূর্ণ চিত্র নয়।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা না হওয়া, মজুরি পর্যালোচনায় বিলম্ব, শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
তবে আন্দোলনের পদ্ধতিরও দায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বা জরুরি সেবার পথ আটকে রাখা সমস্যার সমাধান নয়। আন্দোলনকারী সংগঠন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এমন ব্যবস্থা করা, যাতে শ্রমিকেরা দাবি জানাতে পারেন, আবার সাধারণ মানুষের জীবনও অযথা বিপর্যস্ত না হয়।
মূল প্রশ্নটি হলো, কেন এমন একটি পরিস্থিতি বারবার তৈরি হচ্ছে, যেখানে একদল নিম্ন আয়ের মানুষ নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নামছেন, আরেকদল সাধারণ মানুষ সেই আন্দোলনের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন?
আমরা যদি শুধু এক পক্ষকে দোষারোপ করি, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, মালিকপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ, কার্যকর সরকারি তদারকি এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার ব্যবস্থা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে।
তাহলে সমাধান কী? সব কারখানা কি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত?
সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে সব গার্মেন্টস কারখানা সরকারিকরণ করলেই যে শ্রমিকের সব সমস্যা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকারি বা বেসরকারি—যে ব্যবস্থাতেই কারখানা চলুক, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই মূল বিষয়।
প্রথমত, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কারখানার উৎপাদন খরচ নয়, খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্বসহ স্বচ্ছ ও স্বাধীন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা করতে হবে। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পর তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, পোশাক ব্র্যান্ড, কারখানার মালিক ও সরকারকে উৎপাদন খরচ এবং শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি শিল্পকে টেকসই করা যায় না।
চতুর্থত, শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর আবাসন, শ্রমিক কলোনি বা ডরমিটরি, মানসম্মত সরকারি স্কুল, শিশুদের যত্নের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, উন্নত ড্রেনেজ এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, শ্রমিকদের আন্দোলনের আগেই আলোচনা ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে মজুরি ও অন্যান্য অধিকার নিয়ে বিরোধ দীর্ঘায়িত না হয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমানো যায়।
শেষ কথা: দেশের উন্নয়ন কি শুধু রপ্তানির হিসাব দিয়ে বিচার করা হবে?
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ যদি বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকতে পারে, তাহলে সেই শিল্পের শ্রমিকদের জন্য সম্মানজনক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পারবে না কেন?
যে শ্রমিকের শ্রমে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, তিনি যদি নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পুষ্টিকর খাবার, মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারেন, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল কতটা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে?
শ্রমিকের সন্তান যদি পর্যাপ্ত শিক্ষা ও সুযোগ না পায়, শ্রমিক যদি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হন, আর তাঁর ন্যায্য মজুরির দাবিতে বারবার আন্দোলন সৃষ্টি হয়, তাহলে শুধু রপ্তানির পরিসংখ্যান দিয়ে দেশের উন্নয়নকে সম্পূর্ণভাবে বিচার করা যাবে না।
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নত হয়, বৈষম্য কমে, সন্তানদের সামনে ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের সাফল্য শুধু বিদেশে কত ডলারের পোশাক বিক্রি হলো, তা দিয়ে নয়; সেই পোশাক তৈরি করা শ্রমিকটি কতটা ভালোভাবে বাঁচতে পারলেন, তাঁর সন্তান কতটা ভালোভাবে মানুষ হওয়ার সুযোগ পেল এবং তাঁর পরিবার কতটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে পারল—তা দিয়েও বিচার করা উচিত।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - জাতীয়
- আবারও ন্যায্য মজুরি আদায়ের দাবিতে সড়ক অবরোধ গার্মেন্টস শ্রমিকদের
- শেখ হাসিনার পালানোর ভিডিও প্রকাশ করা সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের মরদেহ উদ্ধার!
- সাভারে মানবিক কর্মকাণ্ডে মানুষের পাশে ছাত্রদল নেতা তমিজ উদ্দিন
- বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হওয়ার পথে এলিজা জামান
- শাহরুখের যে আচরণে সম্পর্ক ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন গৌরী খান
- প্রথমবার ব্যালন ডি’অর জিতে আবেগাপ্লুত হ্যারি কেইন
- চীনের মেগা বাঁধের জবাবে ভারতের সিয়াং প্রকল্প, অরুণাচলে ক্ষোভ
- সাগর-রুনি হত্যা মামলা: টাস্কফোর্স প্রধানকে নথিসহ তলব হাইকোর্টের
- মানিক পশারীর দাফনে বাধার অভিযোগ, জামায়াত-এনসিপিকে নিয়ে রাশেদ খাঁনের সমালোচনা
- গোলাপি স্যাটিনের সাজে নজর কাড়লেন জয়া আহসান
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি আজ পৌঁছাচ্ছে বাংলাদেশে
- পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবি, চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ ডলার
- ৮ মাস পর চালু, দুই দিনের মাথায় ফের বন্ধ যমুনা সার কারখানা
- সালাহউদ্দিনের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন হাসনাতের, চাইলেন স্বচ্ছ হিসাব
- অসংখ্য ডিসেম্বর আসবে-যাবে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন না: রাশেদ খাঁন
- জাতীয় দলের শিবির ছাড়ায় ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে রোনালদো
- শেষ ম্যাচে গোল-অ্যাসিস্ট, সতীর্থদের ভালোবাসায় বিদায় মেসির
- মেসির বিদায়ে রোনালদোর আবেগঘন বার্তা, জানালেন ‘পূর্ণ শ্রদ্ধা’
- রিয়াদ বিমানবন্দরে তৃতীয় দফা হামলার দাবি হুথিদের, ক্ষতিগ্রস্ত বিমান
- সাভারের বনগাঁওয়ে তিন দিনব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম শুরু




