• বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ | ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাগ্য প্রক্রিয়া ও বরকতময় লাইলাতুল বরাত

ভাগ্য প্রক্রিয়া ও বরকতময় লাইলাতুল বরাত

সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৮:৫০ ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রণেতা:সৈয়দ আল্লামা ইমাম হায়াত আলাইহি রাহমা

বরাতের বিস্তৃত অর্থ

ঈমানের বরাত, জীবনের বরাত, দুনিয়ার বরাত, কবরের বরাত, হাশরের বরাত, আখেরাতের বরাত, শান্তির বরাত, সৌভাগ্যের বরাত, মুক্তির বরাত, দোজাহানের সব সৌন্দর্যের বরাত—সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহকে পাওয়ার বরাত এবং প্রাণাধিক প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যের বরাত—এই সবই লাইলাতুল বরাতের গভীর তাৎপর্যের অন্তর্ভুক্ত।

মানুষের জীবন বহু বিষয় ও বাস্তবতার সমন্বয়ে গঠিত। এই জীবনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা, সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য—সবই কিছু স্থায়ী ও কিছু অস্থায়ী উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। স্থায়ী ও মৌলিক বিষয়গুলো মানুষের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে, আর অস্থায়ী বিষয়গুলো সাময়িক সুখ-দুঃখের আবর্ত সৃষ্টি করে। এভাবেই ভাগ্যের প্রকৃতি ও প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে।

জীবনের প্রকৃত সৌভাগ্যের ভিত্তি

জীবনের সত্য উপলব্ধি করা, সত্যের উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া, জীবনের উদ্দেশ্য ও মর্ম অনুধাবন করা, সময়কে অর্থবহভাবে কাজে লাগানো, সঠিক দিশা ও সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের যোগ্যতা অর্জন করা—এসবই জীবনের মৌলিক ও অপরিহার্য উপাদান। এগুলো অর্জিত হলে জীবন আলোকিত হয়; আর এগুলো থেকে বঞ্চিত হলে জীবন অন্ধকার, বিভ্রান্ত ও কলুষিত হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন জীবনের উপকরণ, নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার, সুযোগ ও সামর্থ্য। এসবের মাধ্যমেই জীবনের বিকাশ, সুখ ও সমৃদ্ধি সম্ভব হয়। প্রথম স্তরের বিষয়গুলো ছাড়া জীবন লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে; আর দ্বিতীয় স্তরের বিষয়গুলো ছাড়া জীবন হয় ক্ষতবিক্ষত ও বেদনাদায়ক।

ভাগ্যের উৎস ও রহমতের মূল অছিলা

দোজাহানের সকল দান, নেয়ামত ও শাস্তির উৎস একমাত্র দয়াময় আল্লাহ তাআলা। তবে এসব কিছু খেয়ালখুশিমতো নয়; বরং সুস্পষ্ট ন্যায়ভিত্তিক নিয়ম, কারণ ও পদ্ধতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এই রহমত ও দানের একটি মৌলিক অছিলা রয়েছে, যাকে বলা হয় রাসুলে হাকিকী—আর তিনি হলেন আমাদের প্রাণাধিক প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম।

এই কারণেই কুরআন মাজিদে তাঁকে বলা হয়েছে রাহমাতাল্লিল আলামিন—সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত। তাঁর মাধ্যমেই জীবন অস্তিত্ব লাভ করে, বিকশিত হয় এবং সৌভাগ্যের পথে পরিচালিত হয়।

আল্লাহপ্রদত্ত উপকরণ ও নবীপ্রেরণের উদ্দেশ্য

মানুষের দৈহিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলা আলো, বাতাস, পানি, ভূমি, খাদ্য, শক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছেন। পাশাপাশি দান করেছেন চক্ষু, কর্ণ, বিবেক, বুদ্ধি ও কর্মশক্তি। কিন্তু শুধু এগুলোই যথেষ্ট নয়। তাই মানুষ যেন জীবনের মর্ম উপলব্ধি করে সত্যের পথে চলতে পারে, সে জন্য যুগে যুগে নবী-রাসুল প্রেরণ করা হয়েছে এবং সর্বশেষে প্রেরিত হয়েছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম।

তিনি মানুষকে এমন একটি জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরে ন্যায়, অধিকার, মানবতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে।

সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ভাগ্য

ইসলাম প্রদত্ত শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যত্যয় ঘটলে সমাজে মিথ্যা ও জুলুমের আধিপত্য বিস্তার করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখন গোত্রতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখনই মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, কিছু ভ্রান্ত আলেমও এসব অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এর ফলে বিকৃত হয়েছে দ্বীন, বিপন্ন হয়েছে সমাজ, আর সাধারণ মানুষ ঠেলে দেওয়া হয়েছে বিভ্রান্তির দিকে।

সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য ও মানবিক দায়

দুর্ভাগ্য আলাদা কোনো সত্তা নয়; বরং সৌভাগ্যের উপায় ও উপকরণ থেকে বঞ্চিত হওয়াই দুর্ভাগ্য। ব্যক্তি যখন আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশিত পথে চিন্তা, বিবেক ও জ্ঞান প্রয়োগ করে, তখন সৌভাগ্যের দ্বার উন্মুক্ত হয়। আর যখন সে উদাসীনতা, ভ্রান্ত মতবাদ ও ভুল নেতৃত্ব অনুসরণ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দুর্ভাগ্য নেমে আসে।

এখানে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন স্তরেই দায় ও ভূমিকা বিদ্যমান।

প্রচেষ্টা, অছিলা ও তাওয়াক্কুলের ভারসাম্য

আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্বাধীনতা, শক্তি ও সুযোগ দিয়েছেন এবং তার প্রতিফলও নির্ধারণ করেছেন। তবে শুধু বাহ্যিক প্রচেষ্টাকেই সবকিছু মনে করলে মানুষ নাস্তিক্যবাদের দিকে ধাবিত হয়। আবার অছিলা ও প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করে সবকিছু সরাসরি আল্লাহর নামে চালিয়ে দেওয়াও অজ্ঞতা।

সঠিক পথ হলো—আল্লাহর উপর নির্ভরতা রেখে, তাঁর নির্দেশিত অছিলা অবলম্বন করে সঠিক প্রচেষ্টা চালানো। এই প্রচেষ্টাই লাইলাতুল বরাতের মতো বরকতময় রজনীতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের উপযুক্ত প্রস্তুতি।

লাইলাতুল বরাত কেবল একটি রজনী নয়; এটি মানুষের ভাগ্য পুনর্গঠনের এক মহাসুযোগ। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরে আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশিত পথে ফিরে আসাই এই রজনীর প্রকৃত শিক্ষা। তবেই জীবনে, কবরে ও আখেরাতে বরাত নসিব হবে—ইনশাআল্লাহ।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/