যে গল্প জানলে নতুন করে চিনবেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে


প্রকাশিত: ১১:৪৩ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, লেখক ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাবিদ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জটিল বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার আগ্রহ তৈরি করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য তাঁর লেখা বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি ও উপন্যাস তাঁকে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের University of Washington থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে প্রায় ১৮ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানী হিসেবে গবেষণা করেন। পরে দেশে ফিরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৯৫২ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন, যিনি সাহিত্যিক পরিবারে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর বড় ভাই ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। ছোট ভাই আহসান হাবীব একজন কার্টুনিস্ট ও রম্য লেখক। বাবার চাকরির কারণে শৈশবে জাফর ইকবালকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকতে হয়েছে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
জাফর ইকবালের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাস করেন।
এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৭৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং University of Washington থেকে ১৯৮২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মজীবন
পিএইচডি শেষ করার পর জাফর ইকবাল যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি California Institute of Technology এবং Bell Communications Research-এ দীর্ঘ সময় বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন।
প্রায় ১৮ বছর যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করার পর তিনি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সূচনা করে।
বাংলাদেশে ফিরে শিক্ষকতা
দেশে ফিরে ড. জাফর ইকবাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; শিক্ষার্থীদের গবেষণা, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমে উৎসাহিত করেছেন।
২০১৮ সালের অক্টোবরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন।
বিজ্ঞান জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ভূমিকা
বাংলাদেশে বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে জাফর ইকবালের অন্যতম বড় অবদান তাঁর লেখালেখি।
তিনি জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প, উপন্যাস ও কল্পকাহিনি লিখে তিনি একটি বড় পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন।
তাঁর লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মহাকাশ, রোবট, কম্পিউটার ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছে।
বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জনপ্রিয় লেখক
জাফর ইকবালকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান কল্পকাহিনি জনপ্রিয় করার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প ও উপন্যাস মূলত তরুণ পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লেখা।
তাঁর লেখায় বিজ্ঞান ও কল্পনার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ, রোবট এবং সমাজের নানা বিষয় উঠে আসে।
এ কারণে বাংলাদেশের কিশোর সাহিত্য ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতে তাঁর আলাদা একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
তাঁর জনপ্রিয় লেখালেখি
জাফর ইকবাল বহু উপন্যাস, বিজ্ঞানভিত্তিক বই, কিশোর সাহিত্য ও কলাম লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সিরিজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘টুনটুনি ও ছোটাচ্চু’।
এ ছাড়া তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে সাধারণ পাঠকদের উপযোগী নন-ফিকশন বইও লিখেছেন। তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠিন বিষয়কে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য, বিজ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে:
- বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
- জাতীয় আইসিটি পুরস্কার
- বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মাননা
তাঁর সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক অবদানের কারণে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
তরুণদের প্রতি তাঁর প্রভাব
জাফর ইকবালের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তোলা।
তিনি বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান মেলা, অলিম্পিয়াড, রোবটিকস, প্রোগ্রামিং এবং গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর লেখালেখি ও বক্তৃতার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, বরং আনন্দ ও অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ পেয়েছে অনেক তরুণ।
বিজ্ঞানী থেকে জনপ্রিয় লেখক
জাফর ইকবালের বিশেষত্ব হলো তিনি একই সঙ্গে একজন পেশাদার বিজ্ঞানী এবং জনপ্রিয় লেখক। একদিকে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর গবেষণা করেছেন, অন্যদিকে সাধারণ পাঠকের জন্য বিজ্ঞানকে গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন।
এই দুই পরিচয়ের সমন্বয় তাঁকে বাংলাদেশের অন্যান্য বিজ্ঞানী ও লেখকদের তুলনায় আলাদা একটি অবস্থান দিয়েছে।
ব্যক্তিজীবন
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল লেখক ও শিক্ষাবিদ ইয়াসমিন হককে বিয়ে করেছেন। তাঁদের দুই সন্তান—নাবিল ইকবাল ও ইয়েশিম ইকবাল। তাঁর পারিবারিক জীবনেও শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার পরিবেশের প্রভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চায় অবদান
বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে জাফর ইকবালের ভূমিকা শুধু তাঁর গবেষণা বা শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের আলোচনায় নিয়ে আসতে চেয়েছেন।
বিশেষ করে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা, যুক্তিবাদী মনোভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে তাঁর লেখালেখি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জাফর ইকবালের উত্তরাধিকার
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি বিজ্ঞানকে শুধু গবেষণাগারের মধ্যে আটকে রাখেননি। বরং বিজ্ঞানকে বই, গল্প, বক্তৃতা ও শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
একজন পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং একজন লেখক হিসেবে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে জনপ্রিয়তা—এই দুই পরিচয়ের সমন্বয় তাঁকে দেশের অন্যতম পরিচিত বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
উপসংহার
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের জীবন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। বিদেশে দীর্ঘ সময় গবেষণা করার পর দেশে ফিরে তিনি শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
একজন পদার্থবিজ্ঞানী, শিক্ষক ও লেখক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর লেখা ও চিন্তাধারা ভবিষ্যতেও তরুণদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে—এটাই তাঁর অন্যতম বড় অর্জন।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - জীবনী
- যে গল্প জানলে নতুন করে চিনবেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে
- সংসদে শফিকুর রহমানের কড়া বার্তা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কারও অধীন নয়
- ২০৩০ বিশ্বকাপ ফাইনাল হবে যেখানে, জানাল মরক্কো
- ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে পুতিন, মোদির সঙ্গে বৈঠকে যেসব বিষয়ে আলোচনা
- বিনামূল্যে এআই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সরকার
- চিত্রনায়ক আলমগীরের জীবনী: চলচ্চিত্রজীবন, সাফল্য, পুরস্কার ও অজানা গল্প
- উত্তর আমেরিকা ট্যুরে নতুন রেকর্ড গড়ল বিটিএস
- মায়ের মৃত্যুতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ৫ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তির আদেশ
- বাংলাদেশ দলে কাটছাঁট, আসিয়ান কাপের স্কোয়াড থেকে বাদ ৬ ফুটবলার
- মার্কিন রাস্তা থেকে সরে যান’: ভারতীয়দের নিশানা করে ট্রাম্প প্রশাসনের পোস্টার
- মক্কা প্যাক্টে যোগদান বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়: জামায়াত আমির
- রাজ্জাক দেওয়ান স্মরণে গাইবেন বগা তালেবসহ ১৫ শিল্পী
- প্রতিপক্ষের বাড়িতে অস্ত্র রেখে পুলিশকে ফোন, নিজেই ফাঁসলেন যুবক
- গণভোটের রায় প্রতিষ্ঠিত হলে অলি আহমেদ রাষ্ট্রপতি হতেন: জামায়াত
- ভারতে ‘ভূত আতঙ্কে’ হোস্টেল ছাড়ল ৬০০ শিক্ষার্থী, চিকিৎসকদের ভিন্ন ব্যাখ্যা
- টেস্টোস্টেরন পরীক্ষায় কি লিঙ্গ নির্ধারণ সম্ভব? জানুন বিজ্ঞান কী বলে
- মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র পেলেই রাশিয়ায় হামলা চালাবেন জেলেনস্কি
- ২০-২৫ আগস্ট ভারত সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
- অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিল বাংলাদেশ, হাসানের ৬ উইকেট
- ফের ‘জান্নাত’ নিয়ে আসছেন ইমরান হাশমি, আসছে ‘জান্নাত ৩’



