সেই তুমি হয়ে আজও কোটি হৃদয়ে, রুপালি গিটারের সুরে অমর এক কিংবদন্তি


প্রকাশিত: ১২:৩৪ ১৯ অক্টোবর ২০২৬
পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁরা শুধু নিজের জীবনকে বড় করেন না, একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর কোটি মানুষের হৃদয়কেও সমৃদ্ধ করে দিয়ে যান। তাঁদের চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাস।
বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন তেমনই এক কিংবদন্তি।
এক হাতে গিটার, অন্য হাতে মাইক্রোফোন। চোখে কালো চশমা, মুখে চিরচেনা হাসি। মঞ্চে উঠলেই যেন বদলে যেত চারপাশের পৃথিবী। তাঁর গিটারের প্রতিটি সুরে কখনো থাকত ভালোবাসা, কখনো বিচ্ছেদ, কখনো জীবনের গভীর কষ্ট।
অথচ এই মানুষটির শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। যাঁর সংগ্রহে একসময় বিশ্বের নামীদামি গিটার ছিল, তাঁকেই জীবনের শুরুতে অন্যের গিটার ধার করে বাজাতে হয়েছে। কখনো গিটার ভাড়া নিয়েছেন, কখনো সামান্য অর্থ নিয়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন।
তবু থামেননি।
কারণ তাঁর কাছে গিটার ছিল শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; ছিল নিজের অস্তিত্ব, ভালোবাসা আর স্বপ্নের ভাষা।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান এই কিংবদন্তি। তাঁর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক সেই অসাধারণ জীবন, যার প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে সংগ্রাম, বন্ধুত্ব, আত্মসম্মান, দেশপ্রেম এবং অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প।
চট্টগ্রামের সেই স্বপ্নবাজ ছেলেটি
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর বাবা মোহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী এবং মা নূরজাহান পারভীন। পরিবারের কাছে তাঁর ডাকনাম ছিল রবিন।
চট্টগ্রামের জুবিলি রোড ও আশপাশের এলাকায় কেটেছে তাঁর শৈশব। পড়াশোনা করেছেন সরকারি মুসলিম উচ্চবিদ্যালয়ে।
ছোটবেলা থেকেই গিটারের শব্দের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে বাবার কাছ থেকে প্রথম অ্যাকুস্টিক গিটার পান তিনি। বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সালের কথা পাওয়া যায়।
সেই সময় বাংলাদেশে গিটার শেখার সুযোগ ছিল সীমিত। না ছিল অনলাইন শিক্ষা, না ছিল সহজলভ্য আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র।
চট্টগ্রামের সংগীতশিল্পী জ্যাকব ডায়াসের কাছ থেকে গিটার শেখার সুযোগ পান তিনি। পাশাপাশি নিজের চেষ্টায় নিয়মিত অনুশীলন করতে থাকেন।
কেউ হয়তো তখন কল্পনাও করেননি, এই ছেলেটিই একদিন বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গিটারশিল্পী হয়ে উঠবেন।
ধার করা গিটারেই স্বপ্ন
আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের শুরুটা ছিল সংগ্রামে ভরা।
নিজের ভালো গিটার না থাকায় কখনো বন্ধুর কাছ থেকে ধার করতেন, কখনো ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠানে বাজাতেন।
প্রকাশিত স্মৃতিচারণায় জানা যায়, একসময় দৈনিক ৩০ টাকা ভাড়ায় গিটার নিয়ে মঞ্চে উঠতেন তিনি। অনুষ্ঠানের পারিশ্রমিক থেকে ভাড়া পরিশোধ করে হাতে থাকত সামান্য কিছু টাকা।
ভাবা যায়?
যে মানুষটির গিটারের সুর পরবর্তী সময়ে হাজারো তরুণকে সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে, সেই মানুষটির নিজের গিটার কেনার সামর্থ্যও একসময় ছিল না।
কিন্তু অর্থের অভাব তাঁর স্বপ্নকে পরাজিত করতে পারেনি।
জিমি হেনড্রিক্সসহ আন্তর্জাতিক গিটার কিংবদন্তিদের সংগীত তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁদের কাছ থেকে শেখার পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজের স্বতন্ত্র বাজনার ধরন।
তাঁর জীবন যেন শেখায়, বড় শিল্পী হওয়ার জন্য প্রথমেই দামি যন্ত্র প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় ভালোবাসা, অনুশীলন এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
কুমার বিশ্বজিতের সঙ্গে বন্ধুত্ব
আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের আরেকটি সুন্দর অধ্যায় ছিল জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিতের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব।
চট্টগ্রামে তাঁদের বাড়ি ছিল কাছাকাছি। ছোটবেলা থেকেই দুজনের মধ্যে ছিল গভীর সম্পর্ক এবং সংগীতের প্রতি একই রকম ভালোবাসা।
সেই সময় সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সহজ ছিল না। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল পড়াশোনা শেষে নিরাপদ কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
কিন্তু দুই তরুণের স্বপ্ন ছিল ভিন্ন।

কুমার বিশ্বজিতের স্মৃতিচারণায় জানা যায়, সংগীতচর্চার জন্য বাইরে যেতে কখনো তাঁরা একে অন্যের নাম ব্যবহার করে পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন।
আইয়ুব বাচ্চুর যখন নিজের ভালো গিটার ছিল না, তখন কুমার বিশ্বজিতের কাছ থেকে একটি টেইস্কো গিটার ধার নিয়েছিলেন।
পরে বন্ধুর গিটারের প্রতি গভীর ভালোবাসা দেখে সেটি তাঁকে দিয়ে দেন কুমার বিশ্বজিৎ।
এটি কেবল একটি গিটার উপহার দেওয়ার ঘটনা ছিল না; ছিল একজন বন্ধুর স্বপ্নের প্রতি আরেক বন্ধুর বিশ্বাস।
দুই বন্ধুর সংগ্রামের দিন
পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে দুই বন্ধু একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন।
কুমার বিশ্বজিৎ জানিয়েছেন, একসময় তাঁরা দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
সেই ছোট বাসায় ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, গান নিয়ে আলোচনা, সংগীতচর্চা এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংগ্রাম।
আজ তাঁদের সফলতার ইতিহাস আমাদের সামনে থাকলেও শুরুর দিনের অনিশ্চয়তাগুলো অনেকেই জানেন না।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর কুমার বিশ্বজিৎ গভীর আবেগ নিয়ে সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তাঁর কাছে বাচ্চু ছিলেন বন্ধুর চেয়েও বেশি, নিজের ভাইয়ের মতো।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর একজন চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। অন্যজনের কাছে থেকে গেল অসংখ্য স্মৃতি।
এই বন্ধুত্ব মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো এমন মানুষ পাওয়া, যাঁরা কঠিন সময়েও পাশে থাকেন।
আগলি বয়েজ থেকে সোলস
আইয়ুব বাচ্চুর পেশাদার সংগীতজীবনের শুরু চট্টগ্রামের স্থানীয় ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে।
প্রথমদিকে ‘স্পাইডার’, ‘গোল্ডেন বয়েজ’ এবং ‘আগলি বয়েজ’-এর সঙ্গে তাঁর সংগীতচর্চার কথা পাওয়া যায়।
সত্তরের দশকের শেষ দিকে তিনি ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। এই ব্যান্ডের ইতিহাসের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে রকশিল্পী জেমসের সংগীতজীবনও জড়িয়ে যায়।
ছোট অনুষ্ঠান, ক্লাব এবং সামাজিক আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করেই তৈরি হয়েছিল তাঁর মঞ্চের অভিজ্ঞতা।
১৯৮০ সালে যোগ দেন বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ব্যান্ড ‘সোলস’-এ।
প্রায় এক দশক এই ব্যান্ডের সঙ্গে থেকে গিটারবাদন, সুর, সংগীতায়োজন ও মঞ্চ পরিবেশনায় নিজেকে আরও পরিণত করেন।
‘সুপার সোলস’, ‘কলেজের করিডোরে’, ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ ও ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’-এর মতো অ্যালবাম তাঁর সেই সময়ের সংগীতজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু তাঁর ভেতরে তখনও ছিল নিজের মতো করে সংগীত তৈরির স্বপ্ন।
এলআরবি: এক যুগের জন্ম
১৯৯১ সালে সোলস ছেড়ে নিজের ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন আইয়ুব বাচ্চু।
নাম রাখেন এলআরবি।
প্রথমদিকে ব্যান্ডটির নামের সঙ্গে ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’-এর সম্পর্ক ছিল। পরে পরিচিত হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’ নামে।
একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড ছেড়ে নতুন দল গড়া ছিল বড় ঝুঁকি। কিন্তু নিজের সংগীতভাবনাকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার জন্য সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবাম, যা বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পায়।
এরপর এলআরবি হয়ে ওঠে কয়েক প্রজন্মের প্রিয় ব্যান্ড।
গিটারের শক্তিশালী ব্যবহার, আবেগপূর্ণ বাংলা কথা এবং আইয়ুব বাচ্চুর স্বতন্ত্র কণ্ঠে তৈরি হয় নতুন সংগীতের অভিজ্ঞতা।
এলআরবি প্রমাণ করেছিল, বাংলা ভাষাতেও আধুনিক রকসংগীতের শক্তি ও গভীরতা প্রকাশ করা সম্ভব।
একসময় এলআরবি শুধু একটি ব্যান্ড থাকেনি; হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের তরুণদের ভালোবাসা, কষ্ট আর স্বপ্নের অন্যতম প্রতীক।
সেই তুমি: অমর ভালোবাসা
বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে ‘সেই তুমি’ একটি অনন্য সৃষ্টি।
‘চলো বদলে যাই’ নামেও পরিচিত গানটি ১৯৯৩ সালে এলআরবির ‘সুখ’ অ্যালবামে প্রকাশিত হয়।
কেউ গানটি শুনেছেন প্রথম ভালোবাসার সময়ে। কেউ প্রিয় মানুষকে হারিয়ে। আবার কেউ বহু বছর পর পুরোনো স্মৃতি ফিরে পেতে।
গানটির বিশেষত্ব শুধু কথায় নয়। আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠ ও গিটারের সুর মিলে তৈরি করেছে গভীর আবেগ।
এর জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক যে সংগীতবিষয়ক লেখালেখিতে গানটিকে ‘বাংলা ব্যান্ডসংগীতের অঘোষিত জাতীয় সংগীত’ বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।
এটি আনুষ্ঠানিক কোনো উপাধি নয়; শ্রোতাদের ভালোবাসা প্রকাশের একটি রূপক।
আজও বিভিন্ন কনসার্টে গানটি শুরু হলে হাজারো মানুষ একসঙ্গে কণ্ঠ মেলান।
নতুন প্রজন্মের গিটারশিল্পীরাও গানটির সুর শেখার চেষ্টা করেন।
একজন শিল্পীর মৃত্যুর বহু বছর পরও যখন তাঁর গান মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থাকে, তখন সেই সৃষ্টিই হয়ে ওঠে তাঁর অমরত্ব।
রুপালি গিটারের অমর কান্না
‘এই রুপালি গিটার’ আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের অন্যতম স্মরণীয় গান।
গিটার ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গীদের একটি। সেই গিটারকে কেন্দ্র করেই গানটিতে উঠে এসেছে স্মৃতি, বিদায় এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর পর গানটির আবেগ যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
কারণ মানুষটি সত্যিই একদিন তাঁর সমস্ত গিটার, মঞ্চ আর ভক্তদের রেখে চলে গেছেন।
আজও গানটি শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত দৃশ্য।
একটি বিশাল মঞ্চ, হাজারো দর্শক আর গিটার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আইয়ুব বাচ্চু।
কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষটি আর নতুন কোনো কনসার্টে ফিরবেন না।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু সুর থেকে যায় চিরকাল।
আম্মাজানে অমর এক কণ্ঠ
আইয়ুব বাচ্চু শুধু রকসংগীতের কিংবদন্তি ছিলেন না, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকেও রেখেছিলেন স্মরণীয় অবদান।
তাঁর অন্যতম আবেগপূর্ণ চলচ্চিত্রের গান ‘আম্মাজান’।
১৯৯৯ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গানটির কথা ও সুর করেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।
পর্দায় ছিলেন চিত্রনায়ক মান্না, আর কণ্ঠে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।
যে শিল্পী ইলেকট্রিক গিটার ও শক্তিশালী রকসংগীতের জন্য পরিচিত, তিনিই মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা এমন আবেগে প্রকাশ করেছেন, যা আজও অসংখ্য শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করে।
তাঁর কণ্ঠে ‘আম্মাজান’ শুধু সিনেমার গান হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের স্মরণীয় সংগীত।
এ ছাড়া ‘লুটতরাজ’ চলচ্চিত্রে কনকচাঁপার সঙ্গে ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘ব্যাচেলর’-এ ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’ এবং ‘চোরাবালি’-তে ‘ভুলে গেছি জুতোর ফিতাও বাঁধতে’-সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
‘লাল বাদশাহ’, ‘তেজি’, ‘সাগরিকা’, ‘মিস ডায়ানা’, ‘কালো চশমা’সহ আরও বিভিন্ন চলচ্চিত্রের সংগীতেও তাঁর অবদান রয়েছে।
রকসংগীতের তীব্রতা থেকে মাতৃভালোবাসার কোমল অনুভূতি—সবকিছুতেই তিনি নিজের বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
পকেটে ৬০০ টাকার স্বপ্ন
আইয়ুব বাচ্চুর জীবনসংগ্রামের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো মাত্র ৬০০ টাকা পকেটে নিয়ে ঢাকায় আসার স্মৃতি।
প্রকাশিত স্মৃতিচারণায় তাঁর শুরুর দিনের আর্থিক সংকটের কথা উঠে এসেছে।
ঢাকায় থাকা, খাওয়া, যাতায়াত, বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ এবং নিয়মিত সংগীতচর্চা—সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো সংগীত ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতেন।
কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু তা করেননি।
তিনি জানতেন না ভবিষ্যতে কত বড় শিল্পী হবেন। জানতেন না একদিন তাঁর গান লাখো মানুষ শুনবে কিংবা চট্টগ্রামে তাঁর স্মৃতিতে বিশাল গিটারের ভাস্কর্য নির্মিত হবে।
তবু স্বপ্ন ছাড়েননি।
তাঁর জীবন যেন প্রমাণ করে, পকেটে টাকা কম থাকতে পারে, সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের আকার ছোট হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিদেশে গিটার নিয়ে অপমান
আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময়।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত তাঁর ব্যান্ডের ব্যবস্থাপক শামীমের স্মৃতিচারণায় ঘটনাটি উঠে এসেছে।
নিউইয়র্কে একটি কনসার্ট শেষে আইয়ুব বাচ্চু একটি গিটারের দোকানে যান।
সেখানে কাচের বাক্সে রাখা দামি একটি আইভানেজ গিটার বাজানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
দোকানের ব্যবস্থাপক জানতে চান তিনি কোন দেশের মানুষ।
আইয়ুব বাচ্চু জানান, তিনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।
স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাম শুনে ব্যবস্থাপক তাঁকে গিটারটি না ধরার পরামর্শ দেন।
এতে আইয়ুব বাচ্চু অপমানিত বোধ করেন। তাঁর মনে হয়েছিল, শুধু তাঁকে নয়, তাঁর দেশকেও ছোট করে দেখা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত গিটারটি বাজানোর অনুমতি পান তিনি।
গিটার হাতে তুলে নেন।
শুরু হয় তাঁর অসাধারণ বাজনা।
দোকানের মানুষ মুগ্ধ হয়ে যান। আশপাশে তৈরি হয় ভিড়।
যে গিটারটি তাঁকে প্রথমে ধরতে দেওয়া হচ্ছিল না, সেই গিটার দিয়েই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।
বাজনা শেষে ব্যবস্থাপক মুগ্ধ হয়ে গিটারটি অর্ধেক দামে দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু সেটি গ্রহণ করেননি।
কারণ তাঁর মনে তখনও রয়ে গেছে নিজের দেশের প্রতি অবজ্ঞার সেই আচরণ।
ঘটনাটি প্রকাশিত ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণানির্ভর; দোকানের পক্ষ থেকে স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
তবু এই গল্পে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে, তা হলো নিজের পরিচয় ও দেশের মর্যাদার প্রতি তাঁর গভীর আত্মসম্মানবোধ।
জাপানে গিটারের আরেক বিস্ময়
টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষারের স্মৃতিচারণায় জাপানের একটি গিটারের দোকানকে ঘিরেও আইয়ুব বাচ্চুর অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যায়।
জাপান সফরের সময় একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকানে গিয়ে তাঁরা প্রথমে তেমন গুরুত্ব পাননি বলে স্মৃতিচারণায় উল্লেখ রয়েছে।
পরে একটি গিটার বাজানোর সুযোগ পান আইয়ুব বাচ্চু।
তিনি জিমি হেনড্রিক্স, কার্লোস সান্তানা ও এরিক ক্ল্যাপটনের মতো আন্তর্জাতিক শিল্পীদের বাজনার ধাঁচ তুলে ধরেন।
তাঁর সংগীত শুনে দোকানে মানুষের ভিড় জমে যায়।
শেষদিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতও গিটারে পরিবেশন করেন তিনি।
স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, দোকানের মালিক এতটাই মুগ্ধ হন যে তাঁকে একটি গিটার নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।
এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভার ভাষা কখনো দেশের সীমানায় আটকে থাকে না।
কখনো একটি গিটারের সুরই বিশ্বকে নিজের পরিচয় জানিয়ে দিতে পারে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রকসম্রাট
আইয়ুব বাচ্চুর আন্তর্জাতিক সংগীতজীবন ছিল সমৃদ্ধ।
এলআরবির জীবনী ও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যান্ডটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করেছে।
নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন এবং লন্ডনের ওয়েম্বলি অ্যারেনার মতো পরিচিত ভেন্যুতেও এলআরবির পরিবেশনার কথা পাওয়া যায়। তবে এসব অনুষ্ঠানের ধরন ও পরিসর ভিন্ন ছিল।
বিদেশের মাটিতে বাংলা গান গাওয়া মানে শুধু সংগীত পরিবেশন নয়; নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে তাঁর কনসার্ট ছিল নিজের দেশের আবেগ ফিরে পাওয়ার উপলক্ষ।
আইয়ুব বাচ্চু দেখিয়েছিলেন, বাংলা রকসংগীতের আবেদন দেশের সীমানা অতিক্রম করতেও পারে।
বাংলা রকের নতুন পরিচয়
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাস আজম খান, সোলস, ফিডব্যাক, মাইলসসহ অসংখ্য শিল্পী ও ব্যান্ডের সম্মিলিত অবদানে সমৃদ্ধ।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা।
বিশেষ করে তরুণদের কাছে গিটার জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ছিল অসাধারণ।
শক্তিশালী গিটার সলো, দ্রুতগতির নোট, আবেগপূর্ণ সুর এবং মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করত।
তিনি দেখিয়েছিলেন, রকসংগীত মানেই শুধু উচ্চ শব্দ নয়। এর মধ্যেও থাকতে পারে প্রেম, কষ্ট, স্মৃতি এবং মানুষের জীবনের গল্প।
আন্তর্জাতিক রকসংগীতের শক্তিশালী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেও বাংলা ভাষার আবেগ ধরে রেখেছিলেন তিনি।
গায়ক, গিটারিস্ট, সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর কাজের পরিধি ছিল বিস্তৃত।
তপন চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, শেখ ইশতিয়াক ও এস আই টুটুলসহ বিভিন্ন শিল্পীর সংগীতের সঙ্গেও তাঁর কাজের সম্পর্ক রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বাংলা রকসংগীতে তাঁকে অন্যতম প্রভাবশালী গিটারশিল্পী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। তবে এশিয়ার এক নম্বর গিটারিস্ট হিসেবে তাঁর কোনো স্বীকৃত আনুষ্ঠানিক র্যাঙ্কিং পাওয়া যায়নি।
তাঁর প্রকৃত অর্জন রয়েছে নতুন প্রজন্মের ওপর প্রভাবে।
আজও অসংখ্য তরুণ তাঁর গান শুনে গিটার হাতে তুলে নেন।
যে গানগুলো আজও বেঁচে
আইয়ুব বাচ্চুর অসংখ্য গান বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে।
‘সেই তুমি’, ‘এই রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘এক আকাশের তারা’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘কষ্ট’, ‘ঘুমন্ত শহরে’ এবং ‘বাংলাদেশ’—প্রতিটি গানের আবেগ আলাদা।
কোনো গান মনে করিয়ে দেয় প্রথম ভালোবাসা।
কোনো গান ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের স্মৃতি।
আবার কোনো গান জাগিয়ে তোলে দেশের প্রতি ভালোবাসা।
ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে ডিজিটাল স্ট্রিমিং—সংগীত শোনার মাধ্যম বদলে গেছে।
কিন্তু তাঁর গানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বদলায়নি।
একজন শিল্পীর জন্য এটিই সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিগুলোর একটি।
নামী গিটারের বিশাল সংগ্রহ
একসময় যাঁর নিজের গিটার কেনার সামর্থ্য ছিল না, পরবর্তী জীবনে তাঁর সংগ্রহে ছিল আইভানেজ, ফেন্ডারসহ বিশ্বের নামী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গিটার।
কোনো গিটার ছিল বিশেষ কনসার্টের স্মৃতি। কোনোটি ব্যবহার করেছেন গান রেকর্ডিংয়ে।
তাঁর সংগ্রহের প্রায় ৫০টি গিটার নিয়ে জাদুঘর তৈরির উদ্যোগের কথাও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু এত মূল্যবান গিটার সংগ্রহ করার পরও বাবার দেওয়া প্রথম গিটারটি হারিয়ে যাওয়ার আক্ষেপ তিনি ভুলতে পারেননি।
এই স্মৃতির মধ্যে রয়েছে গভীর ভালোবাসা।
নতুন গিটার কেনা যায়, দামি বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করা যায়।
কিন্তু বাবার দেওয়া প্রথম গিটারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শৈশবের অনুভূতি আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।
অসমাপ্ত গিটার স্কুলের স্বপ্ন
আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের অন্যতম বড় অপূর্ণ স্বপ্ন ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের তরুণেরা মানসম্মত সংগীতশিক্ষা, ভালো বাদ্যযন্ত্র এবং নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পাক।
তাঁর পরিকল্পনায় শুধু গিটার নয়, অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র শেখানোর কথাও ছিল।
কারণ নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, অর্থের অভাবে কত প্রতিভাবান তরুণ মাঝপথে থেমে যান।
এমনকি প্রতিভাবান তরুণ গিটারিস্টদের নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করে নিজের সংগ্রহের গিটার উপহার দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন।
কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এসব পরিকল্পনা তাঁর জীবদ্দশায় পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
তাঁর মৃত্যুর পর আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন সংগীতশিক্ষা, স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে নতুন কোনো আইয়ুব বাচ্চু নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ পাবে।
পনেরো লাখ দর্শকের স্বপ্ন
আইয়ুব বাচ্চু শুধু নিজের পরবর্তী অ্যালবাম কিংবা কনসার্ট নিয়ে ভাবতেন না।
তিনি স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের সংগীতকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার।
একসময় ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে প্রায় ১৫ লাখ দর্শক নিয়ে বিশাল কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
দেশি-বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে বড় পরিসরের সেই আয়োজনের স্বপ্ন তাঁর জীবদ্দশায় পূরণ হয়নি।
১৫ লাখ ছিল তাঁর কল্পিত দর্শকসংখ্যা, অনুষ্ঠিত কোনো কনসার্টের হিসাব নয়।
তবু এই স্বপ্ন তাঁর সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় করে চিন্তা করার মানসিকতার পরিচয় দেয়।
জেমসের চোখে প্রিয় বাচ্চু
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস দুটি অবিস্মরণীয় নাম।
তাঁদের কণ্ঠ, গানের ধরন এবং মঞ্চ পরিবেশনা আলাদা হলেও বাংলা রকসংগীত জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে দুজনেরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর খবর জেমসকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সেদিন একটি অনুষ্ঠানে জেমস তাঁর স্মৃতিচারণা করেন এবং গিটার বাজানোর সময় আবেগ ধরে রাখতে না পেরে মঞ্চ ছেড়ে চলে যান।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শিল্পীদের সম্পর্ক শুধু জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর মধ্যে থাকে দীর্ঘদিনের পরিচয়, একই সময়ের সংগ্রাম এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
পরিবারের কাছে প্রিয় রবিন
মঞ্চে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রকসম্রাট।
কিন্তু পরিবারের কাছে ছিলেন স্বামী, বাবা এবং প্রিয় আপনজন।
তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা। তাঁদের দুই সন্তান—ছেলে তাজওয়ার আইয়ুব এবং মেয়ে ফাইরুজ আইয়ুব।
সংগীতের ব্যস্ততার বাইরেও পরিবার ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী চন্দনা শিল্পীর স্মৃতি ও সংগীতের উত্তরাধিকার সংরক্ষণের উদ্যোগে ভূমিকা রাখছেন।
ভক্তদের কাছে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু একজন কিংবদন্তিকে হারানোর বেদনা।
কিন্তু পরিবারের কাছে সেটি ছিল সবচেয়ে আপন একজন মানুষকে চিরদিনের মতো হারানো।
একজন শিল্পীর উজ্জ্বল পরিচয়ের আড়ালেও যে একজন সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সম্পর্কের জগৎ থাকে, এই বাস্তবতা আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন।
শেষ কনসার্টের অজানা বেদনা
২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর রংপুরে একটি কনসার্টে অংশ নিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।
সেদিনও তাঁর হাতে ছিল গিটার, কণ্ঠে গান এবং সামনে অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা।
সহশিল্পী কোনা পরবর্তী সময়ে জানিয়েছিলেন, সেদিন তাঁকে দেখে অসুস্থ মনে হয়নি। অনুষ্ঠান শেষে সহশিল্পীদের সঙ্গে ছবিও তুলেছিলেন তিনি।
কিন্তু কেউ জানতেন না, সেটিই হতে যাচ্ছে তাঁর জীবনের শেষ কনসার্ট।
যাঁরা সেদিন তাঁর গান শুনেছিলেন, তাঁরা হয়তো বাড়ি ফিরেছিলেন আনন্দ নিয়ে।
মাত্র দুই দিন পর সেই আনন্দ বদলে যায় গভীর শোকে।
কী অদ্ভুত জীবনের বাস্তবতা!
যে মানুষটি গিটারের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, শেষ সময়ের আগপর্যন্তও তিনি ছিলেন সংগীতের মধ্যেই।
যেদিন স্তব্ধ হলো বাংলাদেশ
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর সকালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন আইয়ুব বাচ্চু।
বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর।
সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোক।
শুধু সহশিল্পীরা নন, অসংখ্য সাধারণ মানুষও প্রিয় শিল্পীর মৃত্যুতে ব্যথিত হন।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং অসংখ্য ভক্ত।
পরে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় চট্টগ্রামে।
২০ অক্টোবর চট্টগ্রামের চৈতন্য গলির পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
সেদিন কোনো কনসার্ট ছিল না, ছিল না গিটারের উচ্ছ্বসিত সুর।
তবু ছিল হাজারো মানুষের ভালোবাসা।
একজন শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এটাই—পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা।
চট্টগ্রামে অমর রুপালি গিটার
চট্টগ্রাম ছিল আইয়ুব বাচ্চুর জন্মভূমি।
এই শহরেই তিনি প্রথম গিটার হাতে স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে নির্মিত হয় প্রায় ১৮ ফুট উঁচু একটি গিটারের স্মারক ভাস্কর্য।
নাম দেওয়া হয় ‘রুপালি গিটার’।
প্রবর্তক মোড়ের নামকরণও করা হয় ‘আইয়ুব বাচ্চু চত্বর’।
যে ছেলেটি একসময় নিজের গিটার কেনার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, সেই ছেলেটির স্মৃতিতে তাঁর শহরেই নির্মিত হলো বিশাল গিটারের ভাস্কর্য।
এ যেন জীবনের এক অসাধারণ বৃত্ত পূর্ণ হওয়া।
তবে বিভিন্ন সময়ে স্মারকটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কারণ একজন শিল্পীকে সম্মান জানাতে শুধু স্মারক নির্মাণ নয়, প্রয়োজন তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা।
গিটার জাদুঘরের নতুন স্বপ্ন
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবহৃত গিটার, পোশাক এবং সংগীতসংক্রান্ত স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব গিটার শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বাংলাদেশের আধুনিক সংগীত ইতিহাসের মূল্যবান স্মারক।
আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনায় রয়েছে জাদুঘর, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সংগীতশিক্ষা এবং তরুণ শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
তবে পরিকল্পিত সব সুবিধা ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ চালু হয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক।
কারণ একটি দেশের সংগীত ইতিহাস সংরক্ষণ করা মানে নতুন প্রজন্মকে নিজের সাংস্কৃতিক শেকড় সম্পর্কে জানতে সাহায্য করা।
একুশে পদকে রাষ্ট্রীয় সম্মান
২০২৬ সালে সংগীতে অবদানের জন্য আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
২৬ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা।
একুশে পদক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। মৃত্যুর আট বছর পর এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাঁর অবদানকে নতুনভাবে সামনে আনে।
তাঁর স্ত্রী আবেগের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, আইয়ুব বাচ্চু নিজ হাতে সম্মাননাটি গ্রহণ করতে পারলে অনুভূতি অন্যরকম হতো।
কথাটির মধ্যে রয়েছে গভীর বেদনা।
যাঁর জন্য সম্মাননা, তিনি আর পৃথিবীতে নেই।
তবু তাঁর অর্জন রয়ে গেছে বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসে।
কেন আজও অমর আইয়ুব বাচ্চু
কোনো শিল্পী মৃত্যুর বহু বছর পরও মানুষের হৃদয়ে কীভাবে বেঁচে থাকেন?
উত্তর খুঁজতে হলে আইয়ুব বাচ্চুর গানগুলোর দিকে তাকাতে হয়।
কারও কাছে ‘সেই তুমি’ প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি। কারও কাছে ‘ফেরারি মন’ হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতীক।
আবার কারও কাছে ‘এই রুপালি গিটার’ প্রিয় শিল্পীকে হারানোর বেদনা।
প্রবাসে বসে কেউ তাঁর গান শুনে নিজের দেশকে মনে করেন। কোনো তরুণ প্রথম গিটার হাতে নিয়ে তাঁর গানের সুর বাজানোর চেষ্টা করেন।
এভাবেই তাঁর সংগীত এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যাচ্ছে।
তাঁর উত্তরাধিকার তাই শুধু অ্যালবাম কিংবা কনসার্টের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
তাঁর প্রকৃত প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশের অসংখ্য সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ে।
রয়ে গেল এক রুপালি গিটার
একজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে শেষ পর্যন্ত কী থাকে?
কিছু ছবি? কিছু স্মৃতি? কিছু পুরোনো জিনিস?
আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে রয়ে গেছে আরও অনেক বেশি কিছু।
রয়ে গেছে অসংখ্য গান।
রয়ে গেছে কয়েক প্রজন্মের ভালোবাসা আর যৌবনের স্মৃতি।
রয়ে গেছে কুমার বিশ্বজিতের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের গল্প।
রয়ে গেছে ধার করা গিটার নিয়ে মঞ্চে ওঠা এক তরুণের সংগ্রাম।
রয়ে গেছে বিদেশের মাটিতে নিজের দেশকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরার স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
আর রয়ে গেছে একটি গিটার স্কুল প্রতিষ্ঠার অপূর্ণ স্বপ্ন।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও নতুন শিল্পী জন্ম নেবেন। নতুন ব্যান্ড তৈরি হবে। সংগীতের ধরন বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে।
কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর নাম বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাস থেকে মুছে যাবে না।
কারণ তিনি শুধু গিটার বাজিয়ে যাননি; একটি দেশের তরুণদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।
যে মানুষটি একসময় অন্যের গিটার ধার করে সংগীতচর্চা করেছেন, সেই মানুষটিই একদিন অসংখ্য তরুণের গিটার হাতে তুলে নেওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন।
যিনি নিজের একটি ভালো গিটার পাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনিই পরে অন্য তরুণদের গিটার উপহার দেওয়ার কথা ভেবেছেন।
এখানেই তাঁর জীবনের সৌন্দর্য।
তাঁর সফলতা শুধু নিজের জন্য ছিল না; তিনি ভেবেছিলেন সংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
আজও কোনো নির্জন রাতে তাঁর গান বেজে উঠলে মনে হয়, চিরচেনা সেই মানুষটি যেন আমাদের কাছেই আছেন।
মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
হাতে প্রিয় গিটার।
চোখে কালো চশমা।
মুখে সেই পরিচিত হাসি।
কিন্তু একটু পরেই মনে পড়ে, মানুষটি আর নেই।
থেকে গেছে তাঁর সুর। থেকে গেছে তাঁর ভালোবাসা। থেকে গেছে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন।
আইয়ুব বাচ্চু শুধু একটি নাম নন। তিনি বাংলাদেশের সংগীতের একটি যুগ, একটি আবেগ, একটি অমূল্য রত্ন।
এই রুপালি গিটারের মানুষটি চলে গেছেন, কিন্তু ‘সেই তুমি’ হয়ে আজও বেঁচে আছেন কোটি হৃদয়ে।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - জীবনী
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতায় ফাঁদে পড়েছেন ইশরাক: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
- সালমান খানের সঙ্গে কাজ করলেই হামলার হুমকি, আতঙ্কে বলিউড
- স্বপ্নের নারীকে খুঁজতে ১৯০০ কিলোমিটার পাড়ি, গিয়ে জানলেন তিনি এআই!
- সেই তুমি হয়ে আজও কোটি হৃদয়ে, রুপালি গিটারের সুরে অমর এক কিংবদন্তি
- বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার করলে জেল-জরিমানা, বাতিল হতে পারে লাইসেন্স
- সাত খুন, মেজর সিনহা ও আবরার হত্যা মামলার আপিল শুনানির দিন নির্ধারণ
- দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার ঋণগ্রস্ত, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি: বিবিএস জরিপ
- সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা: নিরপেক্ষ তদন্ত ও হয়রানি বন্ধের দাবি সাংবাদিক জহিরুলের
- ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েই কোটি টাকার আয়, রণবীর কাপুরের সম্পত্তির হিসাব প্রকাশ
- বেহেশতের লোভ দেখিয়ে ভোট নিয়ে দায়িত্বহীন আচরণ করছে বিরোধী দল:প্রতিমন্ত্রী
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি আজ পৌঁছাচ্ছে বাংলাদেশে
- পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবি, চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ ডলার
- ৮ মাস পর চালু, দুই দিনের মাথায় ফের বন্ধ যমুনা সার কারখানা
- জাতীয় দলের শিবির ছাড়ায় ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে রোনালদো
- শেষ ম্যাচে গোল-অ্যাসিস্ট, সতীর্থদের ভালোবাসায় বিদায় মেসির
- মেসির বিদায়ে রোনালদোর আবেগঘন বার্তা, জানালেন ‘পূর্ণ শ্রদ্ধা’
- সালাহউদ্দিনের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন হাসনাতের, চাইলেন স্বচ্ছ হিসাব
- অসংখ্য ডিসেম্বর আসবে-যাবে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন না: রাশেদ খাঁন
- সাভারের বনগাঁওয়ে তিন দিনব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম শুরু
- বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে চোট, মাঠ ছাড়লেন হাশমতউল্লাহ




