• রবিবার , ২৮ জুন, ২০২৬ | ১৩ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসকদের মর্যাদা, স্বাস্থ্যখাতের সংকট এবং রাষ্ট্রের করণীয়

চিকিৎসকদের মর্যাদা, স্বাস্থ্যখাতের সংকট এবং রাষ্ট্রের করণীয়

চিকিৎসকদের মর্যাদা, স্বাস্থ্যখাতের সংকট এবং রাষ্ট্রের করণীয়

মোঃ সুরুজ আলী
মোঃ সুরুজ আলী

প্রকাশিত: ১২:১৩ ২৭ জুন ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে একের পর এক খবর আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এর মধ্যে একটি সংবাদে বলা হয়েছে, দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত ভারতের ত্রিপুরার একটি মেডিকেল কলেজে পাঠদান করছেন। একই সময়ে আরেকটি খবরে অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহকে ঘিরে বিভিন্ন দাবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। এসব তথ্যের কিছু অংশ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ফলে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত—যে কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা।

তবে এসব খবরের বাইরে আরও বড় একটি বাস্তবতা রয়েছে। সেটি হলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট, দক্ষ চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারা এবং সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা। ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আলোচনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা মোকাবিলা করা যায়।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি বাস্তবতা হলো, এখনও দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ অনুযায়ী, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সম্মিলিত ঘনত্ব প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যায় কমপক্ষে ৪৪.৫ জন হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে এই অনুপাত এখনও সেই মানদণ্ডের নিচে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের শূন্য পদ, উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসক সংকট বহুদিনের বাস্তবতা।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশে যান। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দেশেই রাখা সম্ভব হতো, যদি উন্নত বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, আধুনিক হাসপাতাল এবং দক্ষ জনবল আরও বিস্তৃত করা যেত।

এই প্রেক্ষাপটে দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত, অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ কিংবা দেশের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক শুধু ব্যক্তি নন; তাঁরা দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, গবেষণা, চিকিৎসা দক্ষতা এবং নতুন চিকিৎসক তৈরির সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

একজন চিকিৎসক বিদেশে শিক্ষকতা করতে পারেন। এটি কোনো অপরাধ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার সক্ষমতার প্রতিফলন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহু বাংলাদেশি চিকিৎসক ও গবেষক সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না; বরং বাংলাদেশের মানবসম্পদের সক্ষমতাই প্রকাশ পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের ভেতরে তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মতো পরিবেশ কতটা তৈরি করা হয়েছে?

অন্যদিকে, কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেটিও হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই আইনের শাসনের দাবি। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার কিংবা অসমর্থিত তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য বা আংশিক তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যখাতের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন তথ্য মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে। একজন চিকিৎসক সম্পর্কে ভিত্তিহীন তথ্য যেমন তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিও মানুষের বিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্রুত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব। সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি হলেও গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ বাকি। ফলে দক্ষ চিকিৎসকদের অনেকেই বিদেশে গবেষণা, শিক্ষকতা কিংবা উন্নত কর্মপরিবেশের সন্ধান করেন। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, উন্নয়নশীল অনেক দেশেরই বাস্তবতা। তবে দক্ষ জনবল ধরে রাখতে রাষ্ট্রকে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগত পরিবর্তনও প্রায়ই দেখা যায়। অথচ স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি খাত, যেখানে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যনীতি, চিকিৎসা শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যেন পরিবর্তিত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, চিকিৎসকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ ও নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, দক্ষ চিকিৎসকদের বিদেশমুখী হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তথ্যভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

একটি দেশের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানবসম্পদের মানও সেই শক্তির অন্যতম সূচক। দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকদের ঘিরে যদি বারবার বিতর্ক সৃষ্টি হয়, আর একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে বাধ্য হন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

স্বাস্থ্যখাতকে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কারণ একজন দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হতে কয়েক দশক সময় লাগে, কিন্তু তাঁকে হারাতে বা তাঁর দক্ষতাকে অব্যবহৃত করে রাখতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই দেশের চিকিৎসকদের সম্মান, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

— মোঃ সুরুজ আলী
সম্পাদক ও প্রকাশক
মোর নিউজ বিডি

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/