• রবিবার , ২৮ জুন, ২০২৬ | ১৩ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূরাজনীতি নিয়ে বিভ্রান্তির খেলা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার দায় কার?

ভূরাজনীতি নিয়ে বিভ্রান্তির খেলা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার দায় কার?

ভূরাজনীতি নিয়ে বিভ্রান্তির খেলা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার দায় কার?

মোঃ সুরুজ আলী
মোঃ সুরুজ আলী

প্রকাশিত: ১১:৫৪ ২৭ জুন ২০২৬

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেনি; তারা চেয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন, সুশাসন এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, অবিশ্বাস, সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সহনশীল, অংশগ্রহণমূলক এবং উন্নয়নমুখী বাংলাদেশের স্বপ্ন আজ কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সহজ নয়, তবে এটি অসম্ভবও নয়—যদি রাষ্ট্র, রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারে।

এমন এক সময়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে চীন–বাংলাদেশ–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (CBM Economic Corridor) নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠা, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। অন্যদিকে, এমন বড় প্রকল্পের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ এটি এমন একটি বিষয়, যা আবেগ দিয়ে নয়, বরং তথ্য, গবেষণা এবং জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিশ্লেষণ করার দাবি রাখে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে, যা মূল ইস্যু থেকে জনসাধারণের মনোযোগ সরিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসছে। সম্প্রতি সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির নামে পরিচালিত একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা হয়, “আমেরিকা করিডোর চাচ্ছে। চীনও চাইলো। ভারত চাইছে রংপুর বিভাগ কিনে নিতে। গরীবের ভাউজ এখন কি করবে?” পোস্টটি প্রকাশের পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

কেউ পোস্টটিকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আবার কেউ এটিকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বিদ্রূপ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তবে আরেকটি বড় অংশের মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই কারণে যে, পোস্টে এমন একটি দাবি করা হয়েছে যার পক্ষে এ পর্যন্ত কোনো সরকারি, কূটনৈতিক বা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হয়নি। বিশেষ করে “ভারত রংপুর বিভাগ কিনে নিতে চাইছে”—এমন বক্তব্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকার, ভারতের সরকার কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র থেকে এমন কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে দাবিটি যাচাইবিহীন এবং প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি পোস্ট কেবল কয়েকটি বাক্যের সমষ্টি নয়; এটি মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের চিন্তা, আবেগ এবং মনোভাবকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে কোনো সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা কিংবা জনপরিচিত ব্যক্তির বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় তথ্য হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। ফলে তাঁদের প্রতিটি মন্তব্যের সামাজিক দায়ও অনেক বেশি। যদি আলোচিত পোস্টটি সত্যিই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যবহৃত বা অফিসিয়াল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেই প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে আরও দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। ব্যঙ্গ, রূপক কিংবা রাজনৈতিক কৌতুক গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু যখন সেই বক্তব্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তখন তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখছে, সেই স্বপ্নের অন্যতম ভিত্তি হলো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। অতীতের বিভাজন, গুজব, অপপ্রচার এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যনির্ভর আলোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনার চর্চা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য অবশ্যই থাকবে, সরকারের নীতির সমালোচনাও হবে, কিন্তু সেই সমালোচনা যেন তথ্য, যুক্তি এবং বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে হয়। কারণ অযাচাইকৃত বক্তব্য যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তার ক্ষতিকর প্রভাবও তত দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী, ভারত নিকটতম প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। এই বাস্তবতায় কোনো একটি দেশকে ঘিরে আবেগনির্ভর বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কই সৃষ্টি করে না; এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ভুল বার্তা পাঠাতে পারে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ হচ্ছে—সব অংশীদার দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, জাতীয় স্বার্থ এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।

গণমাধ্যমেরও এই সময়ে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের কাজ রাজনৈতিক প্রচারণার বাহন হওয়া নয়; বরং তথ্য যাচাই করা, প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা এবং জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো। একইভাবে নাগরিকদেরও উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার বা বিশ্বাস করার আগে তার উৎস যাচাই করা। কারণ একটি গুজব কখনো কখনো এমন ক্ষতি করতে পারে, যা পরে সত্য প্রকাশ করেও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। জনগণের প্রত্যাশাও সেদিকেই। তাই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির হাতিয়ার না বানিয়ে সেগুলো নিয়ে দায়িত্বশীল, গবেষণাভিত্তিক এবং ইতিবাচক আলোচনা হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক করিডর হবে কি হবে না, তার সুবিধা-অসুবিধা কী—এসব নিয়ে বিস্তৃত বিতর্ক হোক। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন তথ্যের ভিত্তিতে হয়, কল্পনা বা গুজবের ভিত্তিতে নয়।

এই লেখা পর্যন্ত আলোচিত ভাইরাল পোস্টে উত্থাপিত দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ বা ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সতর্কতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীলতা বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক অবস্থান।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের নাম নয়; এটি একটি মানসিক পরিবর্তনেরও নাম। সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা, মতভেদকে সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করা, গুজবের পরিবর্তে তথ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া—এসব মূল্যবোধই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শুধু সরকারের নীতিতে নির্ধারিত হয় না; বরং রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়েই সেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়।

আজ প্রয়োজন বিভ্রান্তির রাজনীতি নয়; প্রয়োজন সত্যভিত্তিক আলোচনা। প্রয়োজন উত্তেজনা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা। প্রয়োজন অপপ্রচার নয়; প্রয়োজন দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ। কারণ একটি নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তার সচেতন নাগরিক, তথ্যনির্ভর জনমত এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান।

— মোঃ সুরুজ আলী
সম্পাদক ও প্রকাশক
মোর নিউজ বিডি

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/