• রবিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৬ | ১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, শেষ আকুতির পর মা ও নবজাতকের মৃত্যু

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, শেষ আকুতির পর মা ও নবজাতকের মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৪৭ ৩০ আগস্ট ২০২৬

‘এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে এই মানুষগুলো আমাকে মেরে ফেলবে’—হাসপাতালের ওয়ার্ডে কাঁদতে কাঁদতে এমন আকুতি জানিয়েছিলেন ভারতের মধ্যপ্রদেশের ২৫ বছর বয়সী প্রসূতি কল্পনা মিশ্র। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে ধারণ করা তার সেই ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরই সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কল্পনা ও তার নবজাতক সন্তানের মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার সরকারি গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে। কল্পনা প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে তাকে হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে অস্থির অবস্থায় দেখা যায়। তিনি স্বজনদের কাছে যেতে এবং হাসপাতাল থেকে বের হতে চাইছিলেন। দায়িত্বে থাকা নার্সিং কর্মীরা তাকে থামানোর চেষ্টা করেন।

মৃত্যুর আগে কল্পনার আর্তনাদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কল্পনাকে কান্নারত অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের কাছে সাহায্য চাইতে দেখা যায়। তিনি জানান, চিকিৎসা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত এবং তার জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি বাঁচব না। দয়া করে আমাকে বাঁচাও, আমার জীবন বিপদের মধ্যে।’ এরপর তিনি বলেন, এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে তাকে মেরে ফেলা হবে। তার এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পরই ঘটে মর্মান্তিক পরিণতি।

সন্তান জন্মের পরই মা-শিশুর মৃত্যু

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কল্পনা ২৫ আগস্ট রাতে রেওয়ার গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয় এবং তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন।

কিন্তু সন্তান জন্মের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কল্পনা ও তার নবজাতক শিশুর মৃত্যু হয়। প্রথম সন্তানকে ঘিরে পরিবারের যে আনন্দের অপেক্ষা ছিল, তা মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে।

পরিবারের অভিযোগ চিকিৎসায় গাফিলতির

কল্পনার পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকদের কাছে বারবার তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন।

কল্পনার বাবা রামশরণ মিশ্র মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে অ্যানেসথেশিয়ার অতিরিক্ত মাত্রা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

পরিবারের অভিযোগের বিপরীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি হয়নি বলে দাবি করেছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কল্পনাকে নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসারেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।

অন্য একটি প্রতিবেদনে হাসপাতালের পক্ষ থেকে কল্পনার গুরুতর শারীরিক জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তার গুরুতর প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া এবং HELLP syndrome-এর মতো জটিলতা ছিল। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

দুই নার্স বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন

মা ও নবজাতকের মৃত্যুর পর হাসপাতালে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্বজনরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ঘটনার পর দায়িত্বে থাকা দুই নার্সিং কর্মকর্তা সাধনা ভার্মা ও সীমা মুজালদেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনা তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে মৃত্যুর কারণ

কল্পনা ও তার নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। চিকিৎসার নথি, অস্ত্রোপচার ও অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং মৃত্যুর আগে কল্পনার শারীরিক অবস্থাসহ পুরো বিষয় তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে।

ফলে পরিবারের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য—দুটির মধ্যে প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, তা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।

তদন্তের দিকে নজর

কল্পনা মিশ্রের মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তার করা আকুতি এবং এরপর মা ও নবজাতকের মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের দায়ী করা এখনই চূড়ান্তভাবে সম্ভব নয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং ময়নাতদন্তের ফলাফলের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও কারও দায় রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন