• রবিবার , ১২ জুলাই, ২০২৬ | ২৭ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার, আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার, আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৫২ ১১ জুলাই ২০২৬

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ এবং দলটির বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ মোকাবিলার কথা জানিয়েছেন তিনি।

আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে নয়াদিল্লি থেকে টেলিফোনে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় জানিয়েছেন। তবে ডিসেম্বরের ঠিক কোন তারিখে ফিরবেন এবং কোন আদালতে হাজির হবেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। শেখ হাসিনা বরাবরই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং তার জীবনের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তারপরও নিজের দেশে ফিরে আইনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, দলের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক চাপ, মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে থাকায় তিনি দূরে বসে থাকতে চান না।

শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নির্বাসিত জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যিনি একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা দেশে ফিরে সম্মিলিতভাবে আদালতে হাজির হবেন।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলটির বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করতে চান সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের ভালো-মন্দের বিচার জনগণের ভোটে হওয়া উচিত। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে তার নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে বলে স্বীকার করলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি বন্ধ করে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ভারতে বসেই দল পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, ইতোমধ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১২৫টি এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। দলের অনেক নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ২০২৪ সালের সরকার পতনের পর দেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দলীয় রাজনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, তার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। ঢাকা একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে ঢাকার সঙ্গে গঠনমূলকভাবে আলোচনা করতে চায় নয়াদিল্লি। স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধেরও অবসান ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবরণ করেছেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তাকে কয়েকবার আটক করা হয়। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও দুর্নীতির অভিযোগে তিনি কারাগারে ছিলেন। পরে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার সরকার গঠন করেন।

দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি সম্প্রসারণে তার সরকারের ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী মত দমন, নির্বাচনী অনিয়ম এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগও তার সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো ছিল। ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সরকার পতনের মধ্য দিয়ে তার টানা শাসনের অবসান ঘটে।

দেশে ফেরার পরিকল্পনা কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার বক্তব্য, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং বিচার নিয়ে গোপন আলোচনার সুযোগ নেই। তবে তার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ বা ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

সূত্র: আল জাজিরা ও রয়টার্স।

বিজ্ঞাপন